অর্ণব সাহা
টানটান উত্তেজনা, বিক্ষিপ্ত গণ্ডগোল, উত্তেজনা ও ৬০ শতাংশেরও কম ভোট পড়ার পর অবশেষে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচনী ফলাফল ঘোষিত হতে চলেছে। এখনও অব্দি
পাওয়া খবর অনুযায়ী ৩০০ আসনবিশিষ্ট সংসদের যে ২৯৯ টিতে ভোট হয়েছিল, তার নিরিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) ২১২ টি এবং বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামী দল ৬৭ টি আসন পেয়েছে। ২০২৪-এর শেখ হাসিনা-বিরোধী জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখ কাণ্ডারী ছাত্র-আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা এনসিপি পেয়েছে মাত্রই ৫ টি আসন এবং অন্যান্য দলগুলি ১১ টি আসন। দুপুর সাড়ে এগারোটা নাগাদ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। ২০০৮-এর নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লিগ বিপুল ভোটে জিতে সরকার গঠনের পর এই প্রথম আরও একটি তুলনামূলক ‘স্বচ্ছ’ নির্বাচন দেখল বাংলাদেশ। কারণ, আওয়ামী জমানায় ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। কার্যত, নির্ধারিত দিনে নয়, তার আগের রাতেই ভোট সমাধা হয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ। নির্বাসিত তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার বিএনপি শেষ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। জামায়াতও সেই ভোটগুলোতে অংশগ্রহণে বিরত থেকেছে। হাসিনা সরকারের লাগামছাড়া দুর্নীতি, সরকার-ঘনিষ্ঠ ক্ষুদ্র মুষ্টিমেয় একটি অলিগার্কির হাতে সম্পদ এবং ক্ষমতার বিপুল অংশের কুক্ষিগত হওয়ার পাশাপাশি সমস্ত বিরোধী শক্তিকে নির্মমভাবে দমন করে হাসিনা যেভাবে কার্যত স্বৈরতন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধেই ছিল ‘জুলাই অভ্যুত্থান’। সেই সমবেত ক্ষোভের আঁচেই আওয়ামী লিগ এইবার ভোটে নিষিদ্ধ। জনগণ ব্যাপক সমর্থন দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন বিএনপিকে। এমনকি সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ অর্থাৎ সংবিধানের গণতন্ত্রীকরণের দাবিতে যে গণভোট হল এবার, তাতেও দেখা যাচ্ছে প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ ‘জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ, মানুষ সংবিধানের সদর্থক পরিবর্তন চাইছেন।

বিএনপির এই জয় প্রত্যাশিত হলেও ভারতের পক্ষে সবচেয়ে চিন্তার হয়ে উঠতে পারে, এই নির্বাচনে জামায়াতের মতো একটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, রাজাকার-আলবদর-আল শাম্স-এর মতো গণহত্যাকারী পাকিস্তানপন্থী দলের এতোগুলো আসন পাওয়া এবং প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠা। জামায়াত হিন্দুসহ সবরকম সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী একটি দল। তারা লাগাতার হিন্দু, বৌদ্ধ, লিবারাল মুসলিম, চাকমা-সহ অন্যান্য উপজাতির মানুষজনের বিরুদ্ধে শারীরিক নৃশংস আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। তারা ভেঙেছে লালনপন্থী সহ একাধিক উদার ইসলামি ঘরানার প্রার্থনাস্থল, মাজার। একইসঙ্গে জামায়াত প্রবলভাবে নারীবিদ্বেষী। তাদের এবারের গোটা প্রার্থীতালিকায় একজনও নারী প্রার্থী ছিল না। ১৯৯১ থেকে পরপর যে চারটি নির্বাচনে তারা ভোটে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রাপ্ত আসনের সংখ্যা যথাক্রমে ১৭, ৩, ১৫ এবং ২। সেদিক থেকে দেখলে তারা আর বাংলাদেশের রাজনীতির প্রান্তিক শক্তি নয়, বরং প্রবল নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে আজ। আর কে না বোঝে, জামায়াতের এই উত্থান পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে তাদের কাউন্টারপার্ট হিন্দুত্ববাদীদেরই হাত আরও শক্ত করবে! বিশেষত, পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে চাইছে বিজেপি, সেখানেও বাংলাদেশের কট্টর শরিয়তি জামায়াতের এই শক্তিবৃদ্ধি বিজেপির ইকোসিস্টেমকেই পুষ্ট করবে আরও। ফলত, আপাতত, বিএনপির এই জয় বাংলাদেশ তথা গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তবুদ্ধি, লিবারাল চেতনার কাছে স্বস্তির কারণ হলেও এটা পরিষ্কার হয়ে গেল, ধর্মীয় আত্মপরিচিতির দক্ষিণপন্থী রাজনীতিই এখন দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে সর্বত্র, কী বাংলাদেশে, কী পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারত তথা গোটা সাউথ-ইস্ট এশিয়াতে। জামায়াত কিন্তু আজ অব্দি একাত্তরে তাদের গণবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি। ফলত, আস্তিনে লুকোনো বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক তাস তারা যে আবারও বড়ো চেহারায় বের করবে না এবং বিএনপি সরকারকে ড্যামেজের চেষ্টা চালাবে না, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।

সর্বোপরি দুর্ভাবনার এটাই যে, জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব যে ছাত্র-যুব জনতার হাতে ছিল, তার নেপথ্যে আসলে জামায়াতের মতো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মেটিকুলাস ডিজাইনই ছিল মুখ্য—এটা আজ দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। তাই ছাত্র-যুবদের হাতে গড়ে ওঠা এনসিপির বৃহদংশ এবার সরাসরি জোট করেছিল জামায়াতের সঙ্গেই। আর তাদের বামপন্থী-মধ্যপন্থী অংশটি শেষ অব্দি এনসিপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সাবেক বাংলাদেশি বামেদের ‘গণ-সংহতি আন্দোলন’-এর জোটে যুক্ত করেছেন নিজেদের। এই জোট শেষ খবর পাওয়া অব্দি মাত্র একটি আসনেই জয়লাভ করেছে। উল্টোদিকে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের আহ্বান—“মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সহ বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী সকলের সমানাধিকারের বাংলাদেশ গড়তে চাই” ছিল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। পাশাপাশি সদ্য শেষ-হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনগুলোতে জামায়েতপন্থী ‘ছাত্রশিবিরের’ একের পর এক জয়, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের জয়লাভ করা থেকে এটাই বোঝা যায়, ‘ছাত্রশিবির’ অত্যন্ত সংগোপনে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করেছে যুবসমাজের তথাকথিত প্রগতিশীল মহলের অন্দরেও। আবার তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প, যা পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর অবিকল প্রতিরূপ, যাতে প্রত্যেক পরিবারের মহিলাদের ২৫০০-৩০০০ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা ব্যাপকভাবে কার্যকরী হয়েছে। মহিলারা ঢেলে ভোট দিয়েছেন বিএনপিকে। একইসঙ্গে গোটা দেশ জুড়ে বামপন্থী-লিবারালদের শোচনীয় খারাপ ফলাফল এটাই প্রমাণ করে ‘পরিচিতিসত্তা’র রাজনীতির এই একুশ শতকীয় বিশ্বজোড়া উত্থানের সামনে তারা অসহায়। বামপন্থাকে নতুনভাবে আবিষ্কারের কষ্টকর ও শ্রমসাধ্য কাজটি না চালিয়ে গেলে তারা অবলুপ্ত হয়ে যাবেন।
বিএনপির এই জয় আপাতত স্বস্তির। কিন্তু ইসলামি কট্টরপন্থী জামায়াতের এই প্রবল উত্থান ভারতের পক্ষে নিশ্চিত শিরঃপীড়ার কারণ হতে চলেছে আগামীদিনে। বিশেষত, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, সেদিকেই তাকিয়ে থাকব আমরা।
* লেখক কলকাতার শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজের শিক্ষক। মতামত লেখকের নিজস্ব।














