পেন্টাগনের নতুন উদ্বেগজনক হিসাব
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি কংগ্রেসের এক শুনানিতে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ এরই মধ্যে ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই অঙ্কটি শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক ধারণা
দেয়, কারণ এর মধ্যে যুদ্ধের সমস্ত দিক অন্তর্ভুক্ত নেই। মে মাসে দেওয়া সর্বশেষ তথ্যের চেয়ে এই ব্যয় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেশি, যা প্রমাণ করে যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পেন্টাগন এখন কংগ্রেসের কাছে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৬৭ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চেয়েছে, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে। এই পরিসংখ্যানগুলো একটি শীতল বাস্তবতা তুলে ধরে—ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অভিযান একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল উদ্যোগে পরিণত হবে।
আর্থিক বোঝা: কোথায় যাচ্ছে এই অর্থ?
যুদ্ধের খরচ কেবল গোলা-বারুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিধি অনেক ব্যাপক। প্রতিদিনের সামরিক অভিযান পরিচালনা, হাজার হাজার সৈন্যের বেতন, অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার এবং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জামের মেরামত বা প্রতিস্থাপনের মতো বিষয়গুলো খরচের খাতকে দীর্ঘায়িত করে। যেমন, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই খরচ হয়েছিল প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। পেন্টাগনের নতুন তহবিলের আবেদনে ২১ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে শুধুমাত্র গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করার জন্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের একটি সস্তা ড্রোনের জবাবে அமெரிக்கা প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে, যা খরচের অসামঞ্জস্যতাকে স্পষ্ট করে। এর বাইরে রয়েছে জ্বালানি খরচ, যা যুদ্ধের কারণে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর পড়ছে।
মানবিক ও কৌশলগত মূল্য: যা ডলারে মাপা যায় না
আর্থিক হিসাবের বাইরেও একটি যুদ্ধের মানবিক ও কৌশলগত খরচ রয়েছে, যা প্রায়শই অপরিসীম। সাম্প্রতিক সংঘাতে এর মধ্যেই প্রায় ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক দিকটি তুলে ধরে। এর পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি অস্থিতিশীল অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার কৌশলগত প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের পথ अवरुद्ध হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এই ধরনের সংঘাত পুরো অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিতে পারে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই মানবিক ও কৌশলগত ক্ষতির পরিমাণ কোনোভাবেই আর্থিক অংকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
কেন এই আলোচনা এখন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই হিসাব এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। ডেমোক্র্যাটরা এই 'অজনপ্রিয়' যুদ্ধকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার চালাচ্ছে, যা জনমত জরিপে তাদের এগিয়ে রাখছে। পেন্টাগনের এই নতুন খরচের হিসাব প্রশাসনকে একটি বার্তা দিচ্ছে যে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আর্থিক ও রাজনৈতিক বোঝা বহন করা কতটা কঠিন হতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, জরুরি তহবিল না পেলে সামরিক প্রশিক্ষণ পর্যন্ত বাতিল করতে হতে পারে।
ভারতের জন্য এর অর্থ কী?
মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের সংঘাত ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। ভারত তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশের জন্য এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীতে কোনো সংকট তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়বে, যা ভারতের অর্থনীতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক কাজ করেন। সংঘাতের ফলে তাদের নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে। ভারত ঐতিহ্যগতভাবে আমেরিকা ও ইরান—উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এই পরিস্থিতিতে একটি যুদ্ধ ভারতের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাই পেন্টাগনের এই বাড়তি খরচের হিসাব এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে আসা ভারতের জন্য একটি স্বস্তির কারণ হতে পারে।















