প্রথমে বোঝা যাক, এল নিনো কী?
এল নিনো একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ 'বালক' বা 'শিশু যিশু'। দক্ষিণ আমেরিকার জেলেরা বহু বছর আগে লক্ষ্য করেন যে, প্রতি কয়েক বছর অন্তর বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
এই ঘটনাকেই তারা এল নিনো নাম দেন। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা যায়। এই সময়ে, প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকের জলস্তর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম হয়ে ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর ফলে কোথাও شدید খরা, আবার কোথাও ভয়াবহ বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
‘সুপার এল নিনো’ কেন এত আলোচনার বিষয়?
'সুপার এল নিনো' কোনও আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়, তবে এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যখন প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি, যেমন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তখন তাকে শক্তিশালী বা 'সুপার' এল নিনো বলা হয়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বাড়ার ফলে এল নিনোর প্রভাব আরও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বর্তমানে যে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। মার্কিন জলবায়ু সংস্থা NOAA জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত একটি শক্তিশালী এল নিনো চলার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের উপর এর প্রভাব কেমন হতে পারে?
ভারতের কৃষি ব্যবস্থা মূলত মৌসুমী বায়ুর উপর নির্ভরশীল। এল নিনোর প্রভাবে এই মৌসুমী বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। কম বৃষ্টি মানেই খরার আশঙ্কা, যা সরাসরি ধান, গম, ডাল এবং অন্যান্য খরিফ শস্যের উৎপাদনে আঘাত হানে। অতীতেও দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনোর বছরগুলিতে ভারতে ফসলের উৎপাদন কমেছে এবং তার ফলস্বরূপ খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ বছরও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদ ও অর্থনীতিবিদরা। কম ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি, তীব্র তাপপ্রবাহ গবাদি পশুপালনের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করে, যা দুধ ও মাংসের দামকেও প্রভাবিত করতে পারে।
খাদ্যদ্রব্যের দাম ২০২৮ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা কেন?
এই নির্দিষ্ট আশঙ্কার মূল উৎস হলো ডার্টমাউথ কলেজের একটি গবেষণা। গবেষকরা অতীতের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনা, যেমন ১৯৮২-৮৩ এবং ১৯৯৭-৯৮ সালের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এর অর্থনৈতিক প্রভাব কেবল এক বছরেই শেষ হয়ে যায় না। একটি শক্তিশালী এল নিনোর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, তা পূরণ হতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়া, পরিকাঠামোর ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যখাতে চাপ বাড়ার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। গবেষণা অনুযায়ী, একটি এল নিনোর প্রভাব প্রায় পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অর্থনীতিতে உணர করা যায়। সেই হিসেবে, যদি ২০২৬-২৭ সালে একটি শক্তিশালী এল নিনো আঘাত হানে, তার অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উঠতে ২০২৮ বা তার বেশি সময় লেগে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যদ্রব্যের দামে।
কোন কোন পণ্যের দাম বেশি বাড়তে পারে?
এল নিনোর প্রভাব বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের উপর পড়ে, তবে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। চাল, কফি, চিনি, কোকো এবং পাম তেলের মতো পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলিতে খরা হলে চালের উৎপাদন কমে। অন্যদিকে, ব্রাজিল এবং ভিয়েতনামের মতো কফি উৎপাদনকারী দেশগুলিতে আবহাওয়ার পরিবর্তনে ফসলের ক্ষতি হয়। যেহেতু এই পণ্যগুলি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে যুক্ত, তাই যেকোনো একটি প্রধান উৎপাদনকারী দেশে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সারা বিশ্বে পড়ে এবং আমদানি নির্ভর দেশ হিসেবে ভারতের বাজারেও তার আঁচ লাগে।














