ভূমিকা বদল: গতি নয়, প্রজ্ঞা
যারা ভেবেছিলেন এই বিশ্বকাপে পুরোনো দিনের মতো ড্রিবলিং করে ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলা মেসিকে দেখবেন, তারা কিছুটা হলেও হতাশ হয়েছেন। কিন্তু যারা পরিণত মেসিকে দেখতে চেয়েছিলেন, তাদের জন্য এই বিশ্বকাপ ছিল এক
মাস্টারক্লাস। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেসি তার খেলার ধরনে এনেছিলেন এক দারুণ পরিবর্তন। তিনি এখন আর উইং ধরে দৌড়ানো সেই স্প্রিন্টার নন, বরং মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধুরন্ধর কন্ডাক্টর। খেলা তৈরি করা, আক্রমণের 방향 নির্ধারণ করা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পাসটি বাড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার মূল কাজ। কোচ লিওনেল স্কালোনিও তার ভূমিকা সেভাবেই নির্ধারণ করেছিলেন। মেসিকে অনেকটা ‘ফ্রি-রোলে’ খেলতে দেখা গেছে, যেখানে তিনি নিজের পছন্দ মতো পজিশন নিয়ে পুরো দলকে পরিচালনা করেছেন। কম দৌড়েও কীভাবে পুরো খেলায় প্রভাব বিস্তার করা যায়, তার এক আদর্শ উদাহরণ ছিলেন এই বিশ্বকাপের মেসি। তার প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি পাস ছিল প্রতিপক্ষের জন্য মারাত্মক।
জাদুকরী মুহূর্ত এবং পরিসংখ্যান
পুরো টুর্নামেন্টে মেসির পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। বয়সের ভারে গতি কিছুটা কমলেও, তার জাদুকরী ছোঁয়া এতটুকুও কমেনি। এই বিশ্বকাপে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাকে সর্বকালের সেরাদের একজন বলা হয়। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও, পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার করা ১৯টি গোলের মধ্যে ১২টিতেই তার সরাসরি অবদান ছিল। অর্থাৎ, দলের মোট গোলের ৬৩ শতাংশই এসেছে তার পা থেকে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়ে দুটি অ্যাসিস্টই ছিল তার। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তার নেওয়া কর্নার থেকেই ম্যাক অ্যালিস্টার গোল করেন, যা ছিল বিশ্বকাপে তার দশম অ্যাসিস্ট—একটি নতুন রেকর্ড। এই পারফরম্যান্স তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জেতার দৌড়েও এগিয়ে রেখেছিল।
শুধু খেলোয়াড় নন, একজন নেতা
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নেতা হিসেবেও মেসি ছিলেন অনন্য। তরুণ খেলোয়াড় যেমন—এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ, এবং আলেহান্দ্রো গারনাচোদের জন্য তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। ড্রেসিংরুমে তার উপস্থিতিই দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাত। কঠিন মুহূর্তে তার শান্ত স্বভাব এবং অভিজ্ঞতা দলকে পথ দেখিয়েছে। বিশেষ করে সেমিফাইনালে পিছিয়ে পড়ার পরও তার শরীরী ভাষা ছিল ইতিবাচক, যা সতীর্থদের মধ্যে জয়ের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। তিনি শুধু নিজে খেলেননি, পুরো দলকে খেলিয়েছেন। মাঠে এবং মাঠের বাইরে তার নেতৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের ঐক্য, আর সেই ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অধিনায়ক মেসি। তার জন্যই তরুণ খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে পেরেছেন।
কিংবদন্তিদের কাতারে কোথায় দাঁড়ালেন তিনি?
৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা এবং এমন পারফরম্যান্স করা ফুটবল ইতিহাসে বিরল। এই বয়সে পেলে ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন, ম্যারাডোনা লড়ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনের সাথে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই বয়সেও খেললেও তার প্রভাব মেসির মতো ছিল না। জিনেদিন জিদান তো কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করে দিয়েছিলেন। সেই তুলনায়, মেসি শুধু খেলেনইনি, বরং দলকে ফাইনালে তুলেছেন এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হলেও, মেসির এই পারফরম্যান্স তাকে ফুটবল ইতিহাসে এক অমর কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফাইনালে মাঠে নামার সাথে সাথে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার রেকর্ড গড়েন। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, প্রতিভা এবং समर्पण থাকলে বয়স কোনো বাধাই হতে পারে না।










