পুরস্কারের ইতিহাস ও শুরুর কথা
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে পুরস্কৃত করার প্রথা শুরু থেকেই প্রচলিত থাকলেও, ‘গোল্ডেন শু’ নামে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ১৯৮২ সালে। পরে ২০১০ সাল থেকে এর নাম পরিবর্তন করে ‘গোল্ডেন বুট’ রাখা হয়। তবে ফিফা
প্রথম বিশ্বকাপ (১৯৩০) থেকেই সর্বোচ্চ গোলদাতাদের এই সম্মানের স্বীকৃতি দিয়েছে। যদি একাধিক খেলোয়াড়ের গোলসংখ্যা সমান হয়, তবে যাঁর অ্যাসিস্ট বেশি, তিনি পুরস্কার পান। এরপরও সমতা থাকলে, সবচেয়ে কম সময় মাঠে থাকা খেলোয়াড়কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
প্রথম দশক ও গোলের সূচনা (১৯৩০-১৯৩৮)
বিশ্বকাপের প্রথম আসর বসেছিল ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে এবং সেখানেই প্রথম গোল্ডেন বুটের বিজয়ী নির্ধারিত হয়। আর্জেন্টিনার গুইলারমো স্তাবিলে ৮ গোল করে এই সম্মান অর্জন করেন। এর পরের দুটি আসরে বিজয়ী ছিলেন চেকোস্লোভাকিয়ার ওল্ডরিখ নেয়েডলি (১৯৩৪, ৫ গোল) এবং ব্রাজিলের লিওনিদাস (১৯৩৮, ৭ গোল)। লিওনিদাসকে 'ব্ল্যাক ডায়মন্ড' নামেও ডাকা হতো এবং তিনি ছিলেন বিশ্বকাপের প্রথমদিকের সুপারস্টারদের একজন।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের নায়করা (১৯৫০-১৯৬৬)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ৯ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন স্বাগতিকদের আদেমির। ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোচিস ১১টি গোল করে নতুন রেকর্ড গড়েন। তবে বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন। তিনি ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ৬ ম্যাচে ১৩টি গোল করেছিলেন, যা আজও অক্ষত একটি রেকর্ড। ১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপে এক বিরল ঘটনা ঘটে, যেখানে মোট ৬ জন খেলোয়াড় ৪টি করে গোল দিয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
ইউসেবিও, জার্ড মুলার ও সত্তরের দশক
১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিও ৯ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন। এরপর ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির জার্ড মুলার ১০ গোল করে এই পুরস্কার নিজের নামে করেন। মুলারকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭৪ সালে পোল্যান্ডের গ্রেগর্জ লাটো ৭ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মান অর্জন করেন এবং পোল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে তৃতীয় স্থান পেতে সাহায্য করেন।
কেম্পেস, রসি ও ম্যারাডোনার যুগ
১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে আর্জেন্টিনাকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন মারিও কেম্পেস। তিনি ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট এবং গোল্ডেন বল দুটোই জেতেন। ১৯৮২ সালে ইতালির পাওলো রসি ৬ গোল করে ইতালিকে বিশ্বকাপ জেতান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ফুটবলের অন্যতম সেরা রূপকথা হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন, যদিও সেবার বিশ্বকাপটি দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে স্মরণীয় হয়ে আছে।
নব্বইয়ের দশকের গোল শিকারিরা
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৬ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জেতেন স্বাগতিকদের সালভাতোরে 'টোটো' শিলাচি। ১৯৯৪ সালে আমেরিকা বিশ্বকাপে দুজন খেলোয়াড় এই পুরস্কার ভাগ করে নেন — রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো এবং বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টইচকভ। দুজনেই ৬টি করে গোল করেন। সালেঙ্কো এক ম্যাচে ৫ গোল করার রেকর্ডও গড়েন, যা আজও অক্ষত। ১৯৯৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে তোলার পথে ডাভর সুকার ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন।
নতুন শতাব্দীর গোলমেশিন
২০০২ সালের জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রোনাল্ডো নাজারিও ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন এবং দলকে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ২০০৬ সালে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা ঘরের মাঠে ৫ গোল করে এই পুরস্কার জেতেন। ক্লোসা পরবর্তীতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জার্মানির থমাস মুলার, স্পেনের ডেভিড ভিয়া, নেদারল্যান্ডসের ওয়েসলি স্নাইডার এবং উরুগুয়ের দিয়েগো ফোরলান— প্রত্যেকেই ৫টি করে গোল করেন। কিন্তু বেশি অ্যাসিস্ট করার সুবাদে গোল্ডেন বুট জেতেন মুলার।
আধুনিক সময়ের নায়ক: হামেস, কেইন ও এমবাপে
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ ৬ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স সবার নজর কাড়ে। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে নিয়ে যাওয়ার পথে অধিনায়ক হ্যারি কেইন ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন। সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করলেও দলকে জেতাতে পারেননি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি ১০ গোল করে এই পুরস্কার জেতেন, যা তাকে টানা দুবার এই সম্মান এনে দেয়।










