অসংখ্য গোল, কিন্তু একটি বিশেষ
পাঁচটি বিশ্বকাপ। ২৬টি ম্যাচ। ১৩টি গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট। এই পরিসংখ্যান লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রার একটা অংশ মাত্র। এর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য ড্রিবল, ডিফেন্স-চেরা পাস আর এমন সব মুহূর্ত যা ফুটবলপ্রেমীদের
মনে চিরকাল থেকে যাবে। সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সেই দলীয় গোল, ইরানের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তের বাঁকানো শট, নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য প্রথম টাচ, কিংবা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনাালের গোল—প্রত্যেকটিরই নিজস্ব আবেদন রয়েছে। কিন্তু যখন স্বয়ং মেসিকে প্রশ্ন করা হয় তাঁর বিশ্বকাপের সেরা গোল কোনটি, তিনি এমন একটি গোলকে বেছে নেন যা হয়তো নান্দনিকতার বিচারে সেরা নয়, কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে ছিল অপরিসীম। সেই গোলটি হলো ২০২২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে করা তাঁর দূরপাল্লার শটের গোলটি।
অগ্নিপরীক্ষা: মেক্সিকোর বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ
এই গোলটির গুরুত্ব বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২২ সালের ২৬শে নভেম্বর, লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই থমথমে সন্ধ্যায়। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারে আর্জেন্টিনার শিবির তখন টালমাটাল। ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার দৌড় থেমে গেছে, আর পরের রাউন্ডে যাওয়ার স্বপ্নটাও ফিকে হতে শুরু করেছে। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ম্যাচটি ছিল কার্যত নকআউট। হারলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত, ড্র করলেও পরের ম্যাচের উপর নির্ভর করে থাকতে হতো। এমন একটি স্নায়ুচাপের ম্যাচে প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। মেক্সিকোর জমাট রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন মেসি, ডি মারিয়ারা। গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মুখে ছিল রাজ্যের চিন্তা। দলটির শরীরী ভাষাতেও ছিল হতাশার ছাপ। ঠিক তখনই প্রয়োজন ছিল একজন ত্রাতার, একজন নেতার, যিনি খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলবেন।
এক ঝলক জাদু: যেভাবে বদলে গেল খেলা
ম্যাচের ৬৪ মিনিট। অ্যাঙ্খেল ডি মারিয়ার পাসটি যখন বক্সের বাইরে মেসির পায়ে এলো, তখনও গোলের তেমন কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। তাঁর সামনে ছিলেন মেক্সিকোর কয়েকজন ডিফেন্ডার। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা জায়গা পেয়েছিলেন মেসি। আর ওই এক মুহূর্তই তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল। বাম পায়ে মাটি ঘেঁষা এক শট নিলেন, যা মেক্সিকান গোলকিপার গييرমো ওচোয়ার নাগালের বাইরে দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। গোটা স্টেডিয়াম ফেটে পড়ে উল্লাসে। ওই একটি গোল শুধু আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে এগিয়ে দেয়নি, বরং দলের ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। ওই গোলের পরেই আর্জেন্টিনা দলটিকে অন্যরকম লাগছিল। খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা বদলে যায়, চাপ কমে যায় এবং তাঁরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে শুরু করে। পরে এনজো ফার্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে নেয়। কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল মেসির ওই গোলটিই।
কেন এই গোলটিই মেসির সবচেয়ে প্রিয়?
বিশ্বকাপ জয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই এই রহস্যের সমাধান করেন। তিনি জানান, মেক্সিকোর বিরুদ্ধে গোলটি তাঁর কাছে সবচেয়ে বিশেষ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, "ওই ম্যাচটা আমাদের জন্য খুব কঠিন ছিল। আমরা প্রথম ম্যাচ হেরে গিয়েছিলাম এবং জানতাম যে এই ম্যাচে জিততেই হবে। ওই গোলটা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং আমাদের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে যে আমরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে পারি।" তাঁর মতে, গোলটি টেকনিক্যালি হয়তো তাঁর সেরা গোলগুলোর মধ্যে পড়ে না, কিন্তু সেই মুহূর্তের পরিস্থিতি, দলের ওপর থাকা প্রবল চাপ এবং সেই গোলের প্রভাব—এই সবকিছু মিলিয়েই এটি তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এটি ছিল এমন একটি গোল যা শুধু স্কোরশিটে নাম তোলেনি, বরং একটি দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখানোর সাহস জুগিয়েছিল। এটি ছিল অধিনায়কের গোল, নেতার গোল।
শুধু একটি গোল নয়, একটি টার্নিং পয়েন্ট
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মেক্সিকোর বিরুদ্ধে মেসির ওই গোলটিই ছিল আর্জেন্টিনার ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের আসল টার্নিং পয়েন্ট। ওই গোলের আগে পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দলটিকে বেশ ছন্নছাড়া মনে হচ্ছিল। কিন্তু ওই মুহূর্তের পর থেকে লিওনেল স্কালোনির দল এক নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। প্রতিটি ম্যাচে মেসি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং দলগত সংহতির এক দারুণ নিদর্শন তৈরি হয়। পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া এবং অবশেষে ফ্রান্স—প্রত্যেকটি বাধাই তারা টপকে যায়। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য দৌড়ের সূচনা হয়েছিল ওই একটি গোল থেকে। তাই যখনই ২০২২ বিশ্বকাপের কথা উঠবে, তখন কিলিয়ান এমবাপের হ্যাটট্রিক বা এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অবিশ্বাস্য সেভের পাশাপাশি মেসির ওই দূরপাল্লার শটটিও সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ ওই গোলটিই ছিল বিশ্বাস, প্রত্যাবর্তন এবং 최종 বিজয়ের প্রথম সোপান।







