ঝাঁঝের পেছনের বিজ্ঞান
সরষের ওই独特 ঝাঁঝালো স্বাদের জন্য দায়ী ‘অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট’ (Allyl Isothiocyanate) নামক একটি রাসায়নিক যৌগ। মজার বিষয় হলো, আস্ত সরষে দানায় কিন্তু এই ঝাঁঝ থাকে না। যখন সরষে বাটা হয় বা জলের সংস্পর্শে
আসে, তখন 'মাইরোসিনেজ' নামক একটি এনজাইম সক্রিয় হয় এবং সরষের মধ্যে থাকা 'সিনিগ্রিন' নামক যৌগটিকে ভেঙে অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট তৈরি করে। এই যৌগটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না এবং দ্রুত উবে যায়, তাই এর গন্ধ ও স্বাদ সরাসরি নাকে ও মস্তিষ্কে গিয়ে এক দারুণ অনুভূতি তৈরি করে, যা লঙ্কার ঝালের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
শুধু তেল নয়, সরষের নানা রূপ
বাঙালি রান্নায় সরষের ব্যবহার শুধু তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর রয়েছে নানা রূপ। রান্নার মূল মাধ্যম হিসেবে সরষের তেল তো আছেই, যা ভাজাভুজি থেকে শুরু করে যে কোনও পদের স্বাদ বাড়িয়ে তোলে। ফোড়ন হিসেবে কালো সরষে ব্যবহার করলে খাবারে এক অন্য মাত্রা যোগ হয়। আবার সরষে বেটে তৈরি হয় নানা পদের মূল মসলা, যেমন— সর্ষে ইলিশ, সর্ষে পাবদা বা সর্ষে দিয়ে বিভিন্ন সবজির পদ। আর আছে বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি ‘কাসুন্দি’— যা গাঁজন করা সরষে দিয়ে তৈরি এক প্রকার সস বা আচার। এই কাসুন্দি যেকোনো সাধারণ খাবারের স্বাদকেও অসাধারণ করে তুলতে পারে। এর প্রতিটি রূপই বাঙালি রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গভীরে
ভারতীয় উপমহাদেশে সরষের ব্যবহার প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পুরোনো। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও এর ঔষধি গুণের উল্লেখ রয়েছে। একটা সময় ছিল যখন বাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রান্নার একমাত্র তেল ছিল ঘানিতে ভাঙা সরষের তেল। এই তেলের ব্যবহার শুধু রান্নায় নয়, বরং শিশুর শরীর মালিশ থেকে শুরু করে নানা ঘরোয়া চিকিৎসাতেও এর প্রয়োগ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য তেল বাজারে এলেও, বাঙালি তার পরিচিত ও প্রিয় সরষের তেলের স্বাদ ও গন্ধ ভুলতে পারেনি। এটি শুধু একটি রান্নার উপকরণ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্যের ধারক।
স্বাস্থ্যগুণ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়
সরষের তেলে রয়েছে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হার্টের জন্য উপকারী। এর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। হজমশক্তি বাড়ানো থেকে শুরু করে ঠান্ডা লাগা উপশমেও এর ব্যবহার প্রচলিত। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সরষের ঝাঁঝালো স্বাদ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের রান্নায় যেখানে নারকেল তেল, বাদাম তেল বা ঘি-এর প্রাধান্য দেখা যায়, সেখানে পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় সরষের তেলের একচেটিয়া আধিপত্যই বাঙালি রান্নার স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে। এটি এমন এক স্বাদ যা দূর প্রবাসেও বাঙালিকে তার শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।












