ডিজিটাল দুনিয়ার অদৃশ্য ইঞ্জিন এই ডেটা সেন্টার
ডেটা সেন্টার হলো একটি সুরক্ষিত ভবন যেখানে হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার সার্ভার, স্টোরেজ ডিভাইস এবং নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম একসাথে কাজ করে। আমরা যখন ক্লাউডে ছবি রাখি, ইমেল পাঠাই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
(AI) ব্যবহার করি, তখন সেই সমস্ত তথ্য এই ডেটা সেন্টারগুলিতেই প্রসেস এবং সংরক্ষণ করা হয়। এককথায়, এটি ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ভারতসহ সারা বিশ্বে ডিজিটাল পরিষেবার চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে আরও বড় এবং শক্তিশালী ডেটা সেন্টার তৈরি হচ্ছে।
কেন এত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়?
ডেটা সেন্টারগুলিকে কার্যত 'বিদ্যুৎ-ক্ষুধার্ত' বলা যেতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো, লক্ষ লক্ষ সার্ভার ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (IEA) মতে, বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ১-১.৫% এই ডেটা সেন্টারগুলো ব্যবহার করে। শুধু সার্ভার চালানোই নয়, এই যন্ত্রগুলি থেকে উৎপন্ন प्रचंड তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যও শক্তিশালী কুলিং সিস্টেম বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা মোট বিদ্যুৎ খরচের একটি বড় অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের ফলে এই চাহিদা আরও দ্রুতগতিতে বাড়ছে, কারণ এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য সাধারণ কাজের চেয়ে অনেক বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হয়।
বিদ্যুতের পাশাপাশি জলের চাহিদা কেন বাড়ছে?
ডেটা সেন্টারের प्रचंड তাপ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে প্রচলিত এবং কার্যকর পদ্ধতিগুলোর মধ্যে একটি হলো জল-ভিত্তিক কুলিং সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে, জল ব্যবহার করে সার্ভারগুলোকে ঠান্ডা রাখা হয়, যা 'ইভাপোরেটিভ কুলিং' নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায়, গরম বাতাসকে ঠান্ডা করার জন্য জল বাষ্পীভূত করা হয়, যার ফলে প্রচুর পরিমাণে জলের প্রয়োজন হয়। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গুগল তার ডেটা সেন্টারগুলিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫০,০০০ গ্যালন জল ব্যবহার করে। মাইক্রোসফটের মতো সংস্থা ২০২২ সালে তাদের সমস্ত ডেটা সেন্টারে প্রায় ৬.৪ মিলিয়ন কিউবিক মিটার জল ব্যবহার করেছে, যা ২,৫০০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমান। ভারতের মতো দেশ, যেখানে ইতিমধ্যেই জলের সংকট রয়েছে, সেখানে ডেটা সেন্টারের এই বিপুল জলের চাহিদা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকট বাড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি-র মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM), ডেটা সেন্টারের শক্তি এবং জলের চাহিদাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই মডেলগুলিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সাধারণ ডেটা প্রসেসিংয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শক্তি এবং কুলিং প্রয়োজন হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, একটি এআই মডেলকে ১০ থেকে ৫০টি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রায় ৫০০ মিলিলিটার জলের প্রয়োজন হতে পারে। সংখ্যাটা ছোট মনে হলেও, যখন প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ এই পরিষেবা ব্যবহার করেন, তখন মোট জলের চাহিদা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলির বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে, যা জাপান বা ভারত-পাকিস্তানের মতো দেশের মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ খরচের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
প্রযুক্তি শিল্পের নতুন চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ
এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলা করা প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফটের মতো বড় সংস্থাগুলি এখন স্থায়িত্বের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এর জন্য তারা বিভিন্ন সমাধানের পথে হাঁটছে। যেমন, আরও শক্তি-সাশ্রয়ী কুলিং সিস্টেম, যেমন লিকুইড কুলিং বা ডাইরেক্ট-টু-চিপ কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে জল সরাসরি চিপের সংস্পর্শে এসে তাপ শোষণ করে। এছাড়াও, নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে এবং ডেটা সেন্টার এমন জায়গায় তৈরি করা হচ্ছে যেখানে প্রাকৃতিক উপায়ে ঠান্ডা রাখা সম্ভব। কিছু সংস্থা পারমাণবিক শক্তির মতো বিকল্প নিয়েও চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। মূল লক্ষ্য হলো 'নেট-জিরো' অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা।
ভারতের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য কী?
ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ডেটা সেন্টার ক্ষমতা প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। কিন্তু ভারতের মতো দেশে, যেখানে বিদ্যুৎ ও জলের মতো সম্পদের ওপর আগে থেকেই ব্যাপক চাপ রয়েছে, সেখানে এই বিস্তার একটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। একদিকে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে পরিবেশগত স্থায়িত্ব বজায় রাখার সংগ্রাম। তাই, ভারতে ডেটা সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। রাজ্য সরকারগুলি এখন এমন নীতি তৈরি করছে যেখানে পরিবেশগত দিকগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।














