স্বপ্নের শুরু এবং প্রথম হোঁচট
২০০৬ সাল, জার্মানি বিশ্বকাপ। ১৮ বছরের এক তরুণ বিস্ময় বালক হিসেবে আর্জেন্টিনা দলে সুযোগ পান লিওনেল মেসি। সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর বিরুদ্ধে পরিবর্ত হিসেবে নেমে একটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করে নিজের আগমনী
বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে আয়োজক জার্মানির বিরুদ্ধে যখন দল টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়, মেসি তখন বেঞ্চে বসে। কোচ হোসে পেকারম্যান তাঁকে মাঠে নামাননি। অনেকেই মনে করেন, সেদিন মেসি মাঠে থাকলে খেলার ফল অন্যরকম হতে পারত। এই ঘটনাটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির প্রথম বড় ধাক্কা এবং সম্ভবত তাঁর কেরিয়ারের প্রথম 'কী হতে পারত' মুহূর্ত। যদিও তখন তিনি ছিলেন বয়সে তরুণ এবং দলের মূল কাণ্ডারি নন, তবুও ফাইনালে ওঠার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সুযোগ না পাওয়াটা তাঁর জন্য ছিল হতাশাজনক।
ম্যারাডোনার ছায়ায় একরাশ ব্যর্থতা
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে মেসি খেলতে গিয়েছিলেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের তকমা নিয়ে। কোচ ছিলেন স্বয়ং ডিয়েগো ম্যারাডোনা। প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে মেসি একটিও গোল করতে পারেননি। দল কোয়ার্টার ফাইনালে সেই জার্মানির কাছেই ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয়। ম্যারাডোনার আবেগ এবং মেসির জাদু—এই দুইয়ের মিশেলে যে স্বপ্ন আর্জেন্টাইনরা দেখেছিল, তা পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। এই ব্যর্থতার পর মেসির জাতীয় দলের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই বলতে শুরু করেন, বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নন। এই সমালোচনা তাঁর উপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করে, যা পরবর্তী কয়েক বছর তাঁকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় আক্ষেপ: ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল
যদি মেসির বিশ্বকাপ কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের কথা বলতে হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনাল। সেই টুর্নামেন্টে মেসি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বলতে গেলে একাই দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। গ্রুপ পর্বে ৪টি গোল করেন, নকআউটেও তাঁর জাদুকরী মুহূর্তগুলো দলকে জিতিয়েছে। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল সেই জার্মানি। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোতজের একটি গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। শিরোপা হাতছাড়া হয় মেসির। ম্যাচের পর টুর্নামেন্ট-সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল পুরস্কারটি নিতে গিয়ে তাঁর বেদনাহত, শূন্য দৃষ্টির ছবিটা আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। মেসি নিজেই একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই হারটি তাঁকে বহু বছর ধরে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাঁর কথায়, “আমরা সবাই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, কারণ আমরা জানতাম আমাদের সুযোগ ছিল। ফাইনালের সেই মুহূর্তগুলো আমি সারাজীবন মনে রাখব।” গোল্ডেন বল জেতাটাও তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হয়েছিল, কারণ দলের সর্বোচ্চ সম্মানটাই যে অধরা থেকে গেল।
শুধু ফাইনাল হার নয়, যন্ত্রণার মুহূর্তগুলো
২০১৪ সালের ফাইনালের আক্ষেপ কেবল হারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেছিল। গঞ্জালো হিগুয়েন, রদ্রিগো প্যালাসিও এবং মেসি নিজেও গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। এই মুহূর্তগুলোই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে। একজন পারফেকশনিস্ট হিসেবে নিজের মান অনুযায়ী খেলতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে কুরে কুরে খেয়েছে। এই হারের পর ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হেরে যায় আর্জেন্টিনা। বারবার ফাইনালে উঠেও ট্রফি জিততে না পারার ব্যর্থতা তাঁকে এতটাই হতাশ করেছিল যে, ২০১৬ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও করে দেন। যদিও পরে সমর্থকদের অনুরোধে এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে তিনি ফিরে আসেন। এই সময়টা ছিল তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়, যার বীজ বপন হয়েছিল ২০১৪ সালের সেই মারাকানার ফাইনালে।
২০২২: অপূর্ণতার বৃত্ত সম্পূর্ণ
অবশেষে ২০২২ সালে এসে মেসি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি পূরণ করেন। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেন তিনি। এই জয়টি ছিল তাঁর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। এই জয়ের পর অনেকেই প্রশ্ন করেন, তাহলে কি ২০১৪ সালের আক্ষেপ এখন মুছে গেছে? উত্তরে বলা যায়, ২০২২-এর জয় ২০১৪-এর ক্ষতকে মুছে দেয়নি, বরং সেই ক্ষতের উপর প্রলেপ দিয়েছে। ওই হারটা ছিল বলেই হয়তো এই জয়ের আনন্দ এতখানি মধুর। ২০১৪-এর সেই শূন্য দৃষ্টির মেসি আর ২০২২-এর বিশ্বজয়ী অধিনায়কের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের ছবি—এই দুটি মিলেই মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা সম্পূর্ণ হয়। ওই আক্ষেপটা ছিল বলেই তাঁর লড়াইটা এত মহাকাব্যিক হয়ে উঠেছে।











