কী এই ‘সিম সোয়াপ’ জালিয়াতি?
এই প্রতারণার নাম ‘সিম সোয়াপ’ বা ‘সিম এক্সচেঞ্জ’ জালিয়াতি। এখানে প্রতারকরা আপনার মোবাইল নম্বরের একটি ডুপ্লিকেট বা নকল সিম কার্ড তুলে নেয়। একবার তারা সফল হলে, আপনার আসল সিমটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং ফোনের
সিগন্যাল পুরোপুরি চলে যায়। আর নতুন সিমটি সক্রিয় হওয়ার সাথে সাথেই আপনার ফোনের সমস্ত কল, বার্তা (বিশেষ করে ওটিপি) প্রতারকদের ফোনে যেতে শুরু করে। যেহেতু आजकल আমাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইউপিআই এবং অন্যান্য ডিজিটাল ওয়ালেটগুলি মোবাইল নম্বরের সাথেই যুক্ত থাকে, তাই ওটিপি হাতে পেয়ে গেলে প্রতারকদের পক্ষে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা বের করে নেওয়াটা খুব সহজ হয়ে যায়।
প্রতারকরা কীভাবে এই কাজটি করে?
এই জালিয়াতির পদ্ধতিটি বেশ পরিকল্পিত। প্রতারকরা বিভিন্ন উপায়ে এই কাজ করে থাকে। প্রথমত, তারা ফিশিং (Phishing) পদ্ধতির সাহায্য নেয়। অর্থাৎ, আপনাকে ফোন করে, এসএমএস বা ইমেল পাঠিয়ে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন - জন্মতারিখ, আধার নম্বর, ব্যাঙ্কের বিবরণ ইত্যাদি কৌশলে জেনে নেয়। তারা নিজেদেরকে মোবাইল কোম্পানির কর্মকর্তা বা ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়। দ্বিতীয় ধাপে, এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে তারা আপনার মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার কাছে গিয়ে আপনার পরিচয় দিয়ে একটি নতুন সিম কার্ডের জন্য আবেদন করে। প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য মিলিয়ে দিতে পারলেই টেলিকম সংস্থা পুরনো সিমটি বন্ধ করে নতুন সিমটি চালু করে দেয়, যা থাকে প্রতারকদের হাতে। অনেক সময় তারা আপনাকে লোভনীয় অফার বা কেওয়াইসি (KYC) আপডেটের নামেও ফোন করে এবং আপনার কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেয়।
সতর্ক হবেন কোন লক্ষণগুলো দেখলে?
সিম সোয়াপ জালিয়াতি থেকে বাঁচতে হলে কিছু লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। যদি দেখেন আপনার ফোন বেশ কিছুক্ষণ ধরে নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে বা ‘No Service’ দেখাচ্ছে, অথচ আশেপাশের অন্যদের ফোনে সিগন্যাল আছে, তাহলে অবিলম্বে সতর্ক হন। কোনো অজানা নম্বর থেকে ফোন করে যদি কেউ নিজেকে টেলিকম কোম্পানির কর্মী পরিচয় দিয়ে আপনার সিম বা নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত কোনো সমস্যা সমাধানের কথা বলে, তবে সাবধান। মনে রাখবেন, কোনো টেলিকম কোম্পানি বা ব্যাঙ্ক ফোন করে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য বা ওটিপি জানতে চায় না। যদি দেখেন আপনার অজান্তেই আপনার কাছে সিম আপগ্রেড বা পরিবর্তনের কোনো রিকোয়েস্ট মেসেজ এসেছে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিন এবং দ্রুত আপনার পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার সাথে কথা বলুন।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে?
প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়। প্রথমত, আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন - আধার নম্বর, প্যান নম্বর, জন্ম তারিখ, ঠিকানা ইত্যাদি অচেনা বা সন্দেহজনক কারো সাথে শেয়ার করবেন না। ফোনে, ইমেলে বা মেসেজে আসা কোনো লিঙ্কে ক্লিক করার আগে ভালোভাবে যাচাই করুন। দ্বিতীয়ত, আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সাথে ইমেল আইডিও সংযুক্ত করে রাখুন। তাহলে এসএমএসের পাশাপাশি ইমেলেও সমস্ত লেনদেনের অ্যালার্ট আসবে। প্রতারকরা সিমের দখল নিলেও, ইমেল অ্যালার্টের মাধ্যমে আপনি দ্রুত লেনদেনের খবর জানতে পারবেন। তৃতীয়ত, আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য (যেমন ফোন নম্বর বা জন্মতারিখ) পাবলিক করে রাখবেন না। প্রতারকরা সেখান থেকেও তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
যদি জালিয়াতির শিকার হন, কী করবেন?
যদি আপনি বুঝতে পারেন যে আপনার সাথে সিম সোয়াপ জালিয়াতি হয়েছে, তাহলে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা চলবে না। সবার আগে আপনার মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে আপনার সিম কার্ডটি অবিলম্বে ব্লক করার অনুরোধ জানান। এরপর, আপনার সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড এবং ডেবিট কার্ড ব্লক করে দিন। এর জন্য আপনি ব্যাঙ্কের হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করতে পারেন। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার নিকটবর্তী থানা বা সাইবার ক্রাইম বিভাগে একটি লিখিত অভিযোগ (এফআইআর) দায়ের করা। ব্যাঙ্ক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর জন্য এই এফআইআরের কপি অত্যন্ত জরুরি।












