ঘুমের জগৎ এবং স্বপ্নের সূচনা
স্বপ্ন বোঝার জন্য প্রথমে আমাদের ঘুমকে জানতে হবে। আমাদের ঘুম মূলত দুটি পর্যায়ে বিভক্ত - নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM)। ঘুমের প্রায় ৭৫ শতাংশই হলো NREM পর্যায়, যেখানে আমাদের শরীর
ও মস্তিষ্ক বিশ্রাম নেয়। বাকি ২৫ শতাংশ হলো REM ঘুম, যা ঘুমের প্রায় ৯০ মিনিট পর শুরু হয়। এই REM পর্যায়েই আমাদের চোখ দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে এবং আমরা সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রাণবন্ত স্বপ্নগুলো দেখি। এই সময় মস্তিষ্ক প্রায় জেগে থাকার মতোই সক্রিয় থাকে।
মস্তিষ্কের কোন অংশগুলো জেগে ওঠে?
স্বপ্ন দেখার সময় আমাদের পুরো মস্তিষ্কই সক্রিয় থাকে, তবে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো লিম্বিক সিস্টেম, যা আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই সিস্টেমের অংশ অ্যামিগডালা (amygdala), যা ভয় ও উদ্বেগের মতো তীব্র আবেগ তৈরি করে, REM ঘুমের সময় বিশেষভাবে সক্রিয় হয়। একারণেই আমাদের স্বপ্নে প্রায়ই তীব্র আবেগ, যেমন - ভয়, আনন্দ বা উত্তেজনা জড়িয়ে থাকে। এছাড়াও, হিপোক্যাম্পাস, যা স্মৃতি তৈরি এবং সংরক্ষণের সাথে জড়িত, এই সময় সক্রিয় থাকে। ফলে, আমাদের দিনের বেলার অভিজ্ঞতা বা পুরনো স্মৃতি স্বপ্নের অংশ হয়ে দেখা দেয়।
যুক্তির লাগাম যখন আলগা
স্বপ্নে আমরা উড়ে বেড়াই, অদ্ভুত সব প্রাণীর সাথে কথা বলি বা অসম্ভব সব কাজ করি, কিন্তু সেই মুহূর্তে সবকিছুই বাস্তব মনে হয়। এর কারণ হলো, স্বপ্ন দেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (prefrontal cortex) অংশটি প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশটি আমাদের যুক্তিবোধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার জন্য দায়ী। এই অংশটি নিষ্ক্রিয় থাকার কারণেই স্বপ্নের অদ্ভুত এবং অযৌক্তিক ঘটনাগুলোকে আমরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নিই। সোজা কথায়, স্বপ্নের জগতে আমাদের 'যুক্তি' ঘুমিয়ে পড়ে।
কেন আমরা স্বপ্ন দেখি: বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব
বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে আমরা ঠিক কেন স্বপ্ন দেখি, তবে এ নিয়ে একাধিক শক্তিশালী তত্ত্ব রয়েছে। একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হলো 'মেমোরি কনসোলিডেশন' বা স্মৃতি গোছানো। এই তত্ত্ব অনুসারে, স্বপ্ন দেখার সময় আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিনের সংগৃহীত তথ্য ও অভিজ্ঞতাগুলোকে গুছিয়ে নেয়। এটি অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি মুছে ফেলে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করার কাজ করে। আরেকটি তত্ত্ব হলো, স্বপ্ন আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি দিনের বেলার মানসিক চাপ বা আঘাতমূলক অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো মনোবিদরা মনে করতেন, স্বপ্ন আমাদের অবদমিত ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: এক অদ্ভুত সুরক্ষা ব্যবস্থা
স্বপ্নে আমরা হয়তো দৌড়াচ্ছি বা কারও সাথে লড়াই করছি, কিন্তু বাস্তবে আমাদের শরীর বিছানায় স্থির হয়ে থাকে। এর কারণ হলো REM এটোনিয়া (REM atonia)। REM ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক শরীরকে একটি সংকেত পাঠায়, যা আমাদের ঐচ্ছিক পেশীগুলোকে সাময়িকভাবে প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেয়। এটি একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা আমাদের স্বপ্নের কার্যকলাপকে বাস্তবে অভিনয় করা থেকে বিরত রাখে এবং সম্ভাব্য আঘাত থেকে রক্ষা করে। এই প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে কাজ না করলে 'REM স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার'-এর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।













