এক ম্যাচে বিতর্ক এবং বিস্ময়: দিয়েগো মারাদোনা (১৯৮৬)
১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক দিয়েগো মারাদোনার করা দুটি গোল সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত অধ্যায়। ম্যাচের ৫১ মিনিটে করা প্রথম গোলটি ছিল
বিতর্কিত 'হ্যান্ড অফ গড'। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের পা থেকে উড়ে আসা একটি বল ক্লিয়ার করতে এগিয়ে এসেছিলেন ইংল্যান্ডের দীর্ঘদেহী গোলকিপার পিটার শিলটন। প্রায় লাফিয়ে ওঠা মারাদোনার মাথা ছুঁয়ে বল জালে জড়ানোর বদলে তাঁর হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। রেফারি গোলের বাঁশি বাজালেও ইংলিশ খেলোয়াড়রা হ্যান্ডবলের জোরালো আবেদন করেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায়নি। মারাদোনা পরে বলেছিলেন, গোলটি ছিল "খানিকটা মারাদোনার মাথা আর খানিকটা ঈশ্বরের হাত" দিয়ে করা। এই গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই আসে সেই মুহূর্ত, যা 'গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি' বা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে পরিচিত। মাঝমাঠ থেকে বল ধরে প্রায় ৬০ মিটার দৌড়ে, পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। এই দুটি গোল—একটি বিতর্কিত চালাকি এবং অন্যটি অবিশ্বাস্য দক্ষতার নিদর্শন—মারাদোনাকে ফুটবলের অমরত্বের আসনে বসিয়েছিল।
অবিশ্বাস্য ছোঁয়ায় ডেনিস বার্গক্যাম্প (১৯৯৮)
নেদারল্যান্ডস এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই ঘটে এক জাদুকরী মুহূর্ত। ম্যাচের ৮৯ মিনিটে ডাচ ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্ক ডি বোরের বাড়ানো প্রায় ৬০ গজের একটি লম্বা পাস ধরেছিলেন ডেনিস বার্গক্যাম্প। অবিশ্বাস্য প্রথম ছোঁয়ায় বলটি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে দ্বিতীয় ছোঁয়ায় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার রবার্তো আয়ালাকে পরাস্ত করেন এবং তৃতীয় ছোঁয়ায় ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে গোলকিপার কার্লোস রোয়াকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন। এই গোলটি ছিল শৈল্পিকতার এক চূড়ান্ত নিদর্শন। ঠান্ডা মাথায়, চরম চাপের মুহূর্তে এমন নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ এবং ফিনিশিং আজও ফুটবল অনুরাগীদের কাছে এক বিস্ময়। ধারাভাষ্যকারের সেই মুহূর্তের উত্তেজনাপূর্ণ চিৎকার "ডেনিস বার্গক্যাম্প! ডেনিস বার্গক্যাম্প!" গোলটির মতোই কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। এই গোলটি নেদারল্যান্ডসকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দিয়েছিল এবং বার্গক্যাম্পের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বুকের ছোঁয়ায় রদ্রিগেজের সেই ভলি (২০১৪)
২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হামেস (উচ্চারণে জেমস) রদ্রিগেজ ছিলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা আবিষ্কার। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে শেষ ষোলোর ম্যাচে তিনি যে গোলটি করেছিলেন, তা তাঁকে এনে দিয়েছিল ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড। ম্যাচের ২৮ মিনিটে সতীর্থের একটি হেড পাস বক্সের বাইরে রিসিভ করেন রদ্রিগেজ। গোলপোস্টের দিকে পিছন ফিরে থাকা অবস্থাতেই বুক দিয়ে বলটি নামিয়ে, ঘুরে গিয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের একটি অসাধারণ ভলিতে বল জালে জড়িয়ে দেন। বলটি ক্রসবারে লেগে জালে প্রবেশ করে, যা গোলটিকে আরও espectacular করে তোলে। গোলটির সৌন্দর্য ছিল তার আকস্মিকতা এবং নিখুঁত কৌশলের মধ্যে। ওই ম্যাচে জোড়া গোল করে রদ্রিগেজ একাই কলম্বিয়াকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন এবং টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে গোল্ডেন বুট জেতেন।
অতিরিক্ত সময়ে ম্যাক্সি রদ্রিগেজের গোল (২০০৬)
আর্জেন্টিনা বনাম মেক্সিকোর ২০০৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটি ১-১ গোলে অমীমাংসিত ছিল। খেলা যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়, তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি পেনাল্টি শুট-আউটের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু ম্যাচের ৯৮ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা ম্যাক্সি রদ্রিগেজ একাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন। সতীর্থ হুয়ান পাবলো সোরিনের ক্রস থেকে আসা বলটি তিনি বক্সের বাইরে বুক দিয়ে রিসিভ করেন। এরপর বল মাটিতে পড়ার আগেই বাঁ পায়ে একটি অসাধারণ ভলি শটে মেক্সিকোর জালে জড়িয়ে দেন। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া সেই শটটি ছিল নিখুঁত, জোরালো এবং অপ্রতিরোধ্য। এই গোলটি শুধু আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দেয়নি, বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ভলি গোল হিসেবেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে। গোলটি সেই বিশ্বকাপের 'সেরা গোল' হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিল।









