এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার শুরু
লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে, সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে পরিবর্ত খেলোয়াড় হিসেবে নেমে গোল করার মধ্যে দিয়ে। তখন তিনি ছিলেন এক তরুণ প্রতিভা, যার কাঁধে তখনও প্রত্যাশার বিশাল বোঝা
চাপেনি। ২০১০ বিশ্বকাপে তিনি মাঠে নামেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে, কিন্তু ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে থাকা আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে বিধ্বস্ত হয়, এবং মেসি একটিও গোল করতে পারেননি। এই দুটি বিশ্বকাপ ছিল তার জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের মঞ্চ, যেখানে ভবিষ্যতের মহাকাব্য লেখার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল মাত্র। এই সময়ের ব্যর্থতাগুলোই তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল, যা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে স্পষ্ট হয়।
বারবার তীরে এসে তরী ডোবা
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল মেসির জন্য নিজেকে প্রমাণের সেরা সুযোগ। তিনি আর্জেন্টিনাকে প্রায় একাই টেনে নিয়ে যান ফাইনালে। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতলেও, মারাকানার সেই ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে যাওয়াটা ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আঘাত। ফাইনালে গোল করার সুযোগ নষ্ট করা এবং শেষ মুহূর্তে তার ফ্রি-কিক বারের উপর দিয়ে চলে যাওয়া—এই দৃশ্যগুলো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তার ভক্তদের হৃদয়ে গেঁথে যায়। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার যেন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের উপর এক অভিশাপের ছায়া ফেলেছিল। এই সময়ের যন্ত্রণা আর হতাশা তার যাত্রাকে আরও বেশি নাটকীয় করে তোলে।
সমালোচনা ও অবসরের ভ্রুকুটি
টানা তিনটি ফাইনালে হারের পর মেসি তীব্র সমালোচনার শিকার হন। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালের পর হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। যদিও দেশের মানুষের অনুরোধে এবং নিজের ভেতরের তাড়নায় তিনি ফিরে আসেন, কিন্তু ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপেও তার দল ব্যর্থ হয়। এই সময়ের মধ্যে তাকে ক্লাবের হয়ে সফল কিন্তু দেশের হয়ে ব্যর্থ—এই তকমা বয়ে বেড়াতে হয়েছে। অনেকেই মনে করেছিলেন, মেসির পক্ষে হয়তো আর বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়। এই অধ্যায়টি তার যাত্রার সবচেয়ে অন্ধকার সময়, যা তার শেষ অধ্যায়ের মহিমাকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
কাতার: যেখানে পূর্ণতা পেল রূপকথা
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এক নতুন মেসিকে দেখল বিশ্ব। তিনি শুধু একজন প্লেমেকার বা গোলদাতা ছিলেন না, ছিলেন একজন সত্যিকারের নেতা। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর আর্জেন্টিনা টানা ৯ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ জয় করে। মেসি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেন এবং টুর্নামেন্টে মোট ৭টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করেন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুটি গোলসহ তার পারফরম্যান্স ছিল অবিশ্বাস্য। এই বিশ্বকাপে তিনি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ (২৬) খেলা, সবচেয়ে বেশি মিনিট (২৩১৪) খেলা এবং দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জেতা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার মতো অসংখ্য রেকর্ড গড়েন। ৩৫ বছর বয়সে এসে তার এই রূপকথার সমাপ্তি ফুটবল ইতিহাসকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।
অন্যান্য কিংবদন্তিদের সঙ্গে তুলনা
পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন, ম্যারাডোনা প্রায় একাই ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছেন। জিনেদিন জিদান বা রোনালদো নাজারিওর মতো কিংবদন্তিদেরও দুর্দান্ত বিশ্বকাপ মুহূর্ত রয়েছে। কিলিয়ান এমবাপের মতো তরুণ তারকারাও ভবিষ্যতে অনেক রেকর্ড ভাঙতে পারেন। কিন্তু মেসির যাত্রার ভিন্নতা হলো এর ব্যাপ্তি আর নাটকীয়তায়। পাঁচবার অংশ নেওয়া, চারটি ফাইনালে (অলিম্পিকসহ) হারের পর শেষবেলায় এসে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে বিশ্বজয়—এইরকম দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য ও ঘটনাবহুল যাত্রা আর কারও নেই। তার গল্প শুধু পরিসংখ্যানের নয়, এ হলো упорство, ধৈর্য আর ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য আখ্যান।








