‘মেসি-ডিপেনডেনসিয়া’: এক যুগের আবর্তন
‘মেসি-ডিপেনডেনসিয়া’ বা মেসি-নির্ভরতা, এই শব্দটি আর্জেন্টাইন ফুটবলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে শুরু করে কোপা আমেরিকার দুটি ফাইনালে হার, সবখানেই দলের ত্রাণকর্তা হিসেবে একাই লড়েছেন
মেসি। যখনই দল খেই হারিয়েছে, সতীর্থরা তাকিয়ে থেকেছেন মেসির জাদুকরী পায়ের দিকে। এই অতিনির্ভরতা কখনও দলকে জিতিয়েছে, আবার কখনও ভুগিয়েছে। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পরেও এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে এসেছে। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি অবিশ্বাস্য ফর্মে খেলে চলেছেন, গোল করছেন এবং করাচ্ছেন, কিন্তু একটি দলের পক্ষে শুধু একজনের ওপর ভর করে প্রতিটি ম্যাচ জেতা প্রায় অসম্ভব। কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজেও স্বীকার করেছেন, দল এখন আগের চেয়ে কম মেসি-নির্ভর। কিন্তু মাঠের খেলায় সেই পরিবর্তন কতটা দৃশ্যমান?
জুলিয়ান আলভারেজ: শুধু একজন গোলশিকারি নন
এইখানেই জুলিয়ান আলভারেজের গুরুত্ব। তিনি শুধু একজন স্ট্রাইকার নন, তার চেয়েও বেশি কিছু। ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গার্দিওলার অধীনে নিজেকে তৈরি করার পর অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে ডিয়েগো সিমিওনের অধীনে তিনি আরও পরিণত হয়েছেন। আলভারেজের খেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং প্রতিপক্ষকে প্রেস করার ক্ষমতা। তিনি আক্রমণভাগের প্রথম ডিফেন্ডার। তার ক্রমাগত দৌড় এবং বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে এবং লিওনেল মেসি, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বা এনজো ফার্নান্দেজের মতো খেলোয়াড়দের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দেয়। লাউতারো মার্তিনেজের সাথে তার স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা থাকলেও, স্কালোনির কৌশলে আলভারেজের গুরুত্ব ভিন্ন। তিনি দলের ইঞ্জিন, যিনি সামনে থেকে পুরো দলকে সচল রাখেন।
স্কালোনির নতুন সমীকরণ: দলগত শক্তির উত্থান
লিওনেল স্কালোনি একজন বাস্তববাদী কোচ। তিনি জানেন, শুধু মেসির ওপর ভর করে আরেকটি বিশ্বকাপ জেতা কঠিন। তাই তিনি এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছেন যেখানে মেসি তার স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারেন, কিন্তু গোলের জন্য পুরো দলকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আলভারেজ। আলভারেজ যখন ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখেন, তখন মেসি একটু নিচে নেমে এসে প্লে-মেকারের ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে তিনি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং আক্রমণে বৈচিত্র্য আনতে পারেন। কেপ ভার্দে বা মিশরের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচগুলোতে দেখা গেছে, আর্জেন্টিনা যখন চাপে পড়েছে, তখন শুধু মেসি নন, রদ্রিগো ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এমনকি লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মতো খেলোয়াড়রাও দায়িত্ব নিচ্ছেন। আক্রমণভাগে এখন একাধিক উৎস থেকে গোল আসছে, যা দলটিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে।
মেসির নতুন ভূমিকা: নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক
আলভারেজের উত্থানের ফলে মেসির ভূমিকাও বদলে গেছে। তাকে এখন আর প্রতিটি আক্রমণে বল পায়ে নিয়ে ডিফেন্ডারদের জটলার মধ্যে দৌড়াতে হয় না। তিনি এখন অনেকটা অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো, যিনি পেছন থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন। তার অভিজ্ঞতা এবং অতুলনীয় দৃষ্টি কাজে লাগিয়ে তিনি সঠিক সময়ে সঠিক পাসটি বাড়িয়ে দেন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আমরা একজন নতুন মেসিকে দেখছি, যিনি গোল করার পাশাপাশি খেলা তৈরিতেও সমান মনোযোগী। চলতি টুর্নামেন্টে তার গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা এটাই প্রমাণ করে যে তিনি এখনও দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, কিন্তু তার প্রভাব এখন আরও সূক্ষ্ম এবং কৌশলগত। তিনি নিজে গোল করে দলকে জেতাচ্ছেন, আবার সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিচ্ছেন।









