‘বসে থাকা’ কেন নতুন ধূমপান?
আধুনিক সময়ে চিকিৎসকেরা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকাকে ‘নতুন ধূমপান’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ, একটানা বসে থাকলে শরীরের বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম প্রায় ৯০% পর্যন্ত কমে যায়। এর ফলে ক্যালোরি পোড়ানোর হার কমে আসে
এবং শরীরে চর্বি জমতে শুরু করে। আমরা যখন হাঁটাচলা করি বা সক্রিয় থাকি, তখন আমাদের পেশীগুলো রক্ত থেকে শর্করা এবং চর্বি গ্রহণ করে শক্তি উৎপাদন করে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় থাকলে, এই প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় এবং খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়তে থাকে, যা বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
মেরুদণ্ড, ঘাড় এবং পেশির ওপর প্রভাব
আইটি পেশাজীবীদের মধ্যে কোমর ও ঘাড়ের ব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা। একটানা ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যায় এবং ডিস্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে ক্রনিক কোমর ব্যথা এবং ‘সায়াটিকা’র মতো যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে কাজ করার ফলে ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়, যাকে ‘টেক নেক’ বলা হয়। সময়ের সাথে সাথে এটি সার্ভিকাল স্পন্ডাইলাইটিসের মতো জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়াও, নিষ্ক্রিয়তার কারণে নিতম্ব এবং পায়ের পেশিগুলো দুর্বল ও শক্ত হয়ে যায়।
হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে আট ঘণ্টার বেশি সময় বসে কাজ করেন, তাদের হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সক্রিয় ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায়, যার ফলে রক্তনালিতে ফ্যাট বা চর্বি জমা সহজ হয়। এটি উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং মেটাবলিক সিনড্রোমের মতো সমস্যার জন্ম দেয়, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। একইসাথে, কোষগুলো ধীরে ধীরে ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা হারায়, ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
মানসিক স্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে
শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে মস্তিষ্কে রক্ত এবং অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে মনোযোগ কমে যাওয়া, ক্লান্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ধীর হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে বেশি সময় বসে কাটান, তাদের মধ্যে উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতার লক্ষণ বেশি দেখা যায়, এমনকি যদি তারা কাজের বাইরে নিয়মিত ব্যায়ামও করেন।
প্রতিকার আপনার হাতের মুঠোয়
তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। দৈনন্দিন রুটিনে কিছু ছোট পরিবর্তন এনেই এই ঝুঁকিগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর চেয়ার থেকে উঠে ২-৩ মিনিটের জন্য হাঁটাহাঁটি করুন বা হালকা স্ট্রেচিং করুন। কাজের ফাঁকে সহকর্মীর ডেস্কে হেঁটে গিয়ে কথা বলুন, ফোনের ব্যবহার কমান। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার কাজের জায়গাটিকে ארগোনোমিক বা শরীরবান্ধব করে তুলুন; চেয়ার ও ডেস্কের উচ্চতা ঠিক রাখুন, যাতে কম্পিউটার স্ক্রিন চোখের সমান্তরালে থাকে। কাজের ফাঁকে ঘাড়, কাঁধ ও কব্জির সহজ ব্যায়ামগুলো করে নিতে পারেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন, এটি আপনাকে সতেজ রাখবে এবং বারবার বাথরুমে যাওয়ার অজুহাতে হাঁটার সুযোগ করে দেবে।












