অফুরন্ত গোলক্ষুধা: বর্তমান ফর্ম কী বলছে?
২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে যখন আর্জেন্টিনা দল মাঠে নামবে, তখন তাদের অধিনায়কের বয়স থাকবে ৩৯। এই বয়সে একজন ফুটবলারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারফরম্যান্স আশা করাটা কঠিন। কিন্তু লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে
পরিসংখ্যান এবং বাস্তবতা যেন সব প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তকমা গায়ে জড়িয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বর্তমানে তিনি মেজর লিগ সকারে ইন্টার মায়ামির হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপেও যে তিনি আর্জেন্টিনার মূল কাণ্ডারি, তা কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। চলতি বিশ্বকাপেও তাঁর পারফরম্যান্স ঈর্ষণীয়। গ্রুপ পর্ব ও নকআউটের শুরুতেই তিনি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিজেকে শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছেন। মিশরের বিপক্ষে পিছিয়ে পরেও আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে তিনি একটি গোল করেন এবং অন্য গোলে সহায়তা করেন। এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে, বয়স বাড়লেও গোল করার সহজাত ক্ষমতা এবং ম্যাচ জেতানোর মানসিকতায় এতটুকু মরচে ধরেনি।
ইতিহাসের পাতা ও বয়সের বাস্তবতা
বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল্ডেন বুট জেতা কখনোই সহজ ছিল না, আর ৩৯ বছর বয়সে তো তা প্রায় অকল্পনীয়। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ড ক্যামেরুনের রজার মিলার, যিনি ৪২ বছর বয়সে গোল করেছিলেন। কিন্তু গোল্ডেন বুট বিজয়ীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা প্রায় সবাই নিজেদের সেরা সময়ে এই পুরস্কার জিতেছেন। যেমন, ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ১৩ গোল করে রেকর্ড গড়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়েও কিলিয়ান এমবাপ্পে বা হ্যারি কেনের মতো খেলোয়াড়েরা নিজেদের সেরা ফর্ম থাকাকালীন এই পুরস্কার পেয়েছেন।历史上 কোনো খেলোয়াড় ৩৯ বছর বয়সে গোল্ডেন বুট জেতেননি। এমনকি এই বয়সে বিশ্বকাপে খেলা স্ট্রাইকারের সংখ্যাও খুব কম। শারীরিক সক্ষমতা এক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে গতি কমে আসে, মাঠে দৌড়ানোর পরিমাণও কমে যায়। ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেসি এখন মাঠে অনেক বেশি হেঁটে খেলেন, যা তাঁর শক্তি সঞ্চয়ের একটি কৌশল। তিনি পুরো ম্যাচ জুড়ে একই গতিতে না খেলে, সঠিক মুহূর্তে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। এই বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শারীরিক সীমাবদ্ধতা কতটা পূরণ করা সম্ভব, তার ওপরই নির্ভর করছে তাঁর গোল্ডেন বুট জয়ের সম্ভাবনা।
কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা: এমবাপ্পে, হালান্ড এবং অন্যরা
মেসির গোল্ডেন বুট জয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবেন বর্তমান প্রজন্মের সেরা স্ট্রাইকাররা। এই দৌড়ে সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০২২ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী এমবাপ্পে ২০২৬ বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ফর্মে আছেন এবং গোলসংখ্যার দিক থেকে মেসির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন। নরওয়ের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নামা আর্লিং হালান্ডও গোল করার জন্য মুখিয়ে আছেন এবং ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি গোল করে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেনও এই দৌড়ে বেশ ভালোভাবে আছেন। এছাড়া ব্রাজিলের ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং ফ্রান্সের উসমান ডেম্বেলের মতো খেলোয়াড়রাও যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের রঙ বদলে দিতে পারেন। এদের প্রত্যেকেই মেসির চেয়ে বয়সে তরুণ, গতিশীল এবং শারীরিক দিক থেকে এগিয়ে। এই তরুণ তুর্কিদের সাথে পাল্লা দিয়ে গোল করে যাওয়া মেসির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হবে। প্রতিটি ম্যাচে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং নিজের দলকে টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া—এই দুটি বিষয়ই তাঁর গোল্ডেন বুট জয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
বদলে যাওয়া ভূমিকা: প্লেমেকার নাকি গোলস্কোরার?
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেসি তাঁর খেলার ধরনে অনেক পরিবর্তন এনেছেন। একসময় তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য ড্রিবলার ও গোলস্কোরার। এখন তিনি অনেক বেশি প্লেমেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মাঠের গভীর থেকে খেলা তৈরি করা, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করায় তিনি এখন বেশি মনোযোগ দেন। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচেও দেখা গেছে, তিনি নিজে গোল করার পাশাপাশি ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর গোলের উৎস ছিলেন। আর্জেন্টিনার বর্তমান দলে হুলিয়ান আলভারেজের মতো তরুণ স্ট্রাইকাররা থাকায় মেসির ওপর গোল করার চাপ কিছুটা কমেছে। যদি কোচ স্কালোনি মেসিকে একজন প্রধান গোলস্কোরারের বদলে একজন সংগঠকের ভূমিকায় বেশি ব্যবহার করেন, তবে গোল্ডেন বুট জেতা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ এই পুরস্কারটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত গোলসংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। তবে, পেনাল্টি এবং ফ্রি-কিকের মতো সেট-পিসগুলো থেকে গোল করার সুযোগ তাঁর থাকবে। তাই তাঁর ভূমিকা কী হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।










