বাজারের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানিগুলির (NBFC) সোনার ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত, এনবিএফসি-গুলির
বকেয়া সোনার ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়ে ৩.৩ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর একই সময়ে ১.৯৪ লক্ষ কোটি টাকা ছিল। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সোনার ঋণ এখন ভারতীয় অর্থনীতিতে একটি দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র গ্রামীণ বা আধা-শহুরে অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শহুরে পেশাদার এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
সোনার দাম বৃদ্ধি এবং তার প্রভাব
সোনার ঋণের চাহিদা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সোনার ক্রমবর্ধমান দাম। গত কয়েক বছরে সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর ফলে, সাধারণ মানুষ তাদের কাছে থাকা একই পরিমাণ সোনার গয়নার বিনিময়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি অঙ্কের ঋণ পাচ্ছেন। যখন সোনার দাম বাড়ে, তখন বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্যও বেড়ে যায়, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি বড় সুবিধা। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন বছরে সোনার মূল্য সূচক প্রায় ১৪৪ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে সোনার ঋণ অনুমোদনের পরিমাণ বেড়েছে ২০০ শতাংশের বেশি। এর ফলে গড় ঋণের পরিমাণও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সহজ প্রক্রিয়া এবং দ্রুত ঋণ প্রাপ্তি
অন্যান্য ঋণের তুলনায় সোনার ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সহজ এবং দ্রুত। পার্সোনাল লোন বা অন্যান্য অসুরক্ষিত ঋণের ক্ষেত্রে যেখানে ক্রেডিট স্কোর, আয়ের প্রমাণ এবং একাধিক নথিপত্রের প্রয়োজন হয়, সেখানে সোনার ঋণের জন্য মূলত সোনার গয়না এবং গ্রাহকের পরিচয়পত্রই যথেষ্ট। ব্যাঙ্ক এবং এনবিএফসি-গুলি খুব কম সময়ের মধ্যে ঋণ অনুমোদন করে দেয়, যা জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে মানুষের কাছে একটি বড় আকর্ষণ। এই কারণে, চিকিৎসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা বা ব্যবসার জন্য হঠাৎ টাকার প্রয়োজন হলে অনেকেই সোনার ঋণকে বেছে নিচ্ছেন।
এনবিএফসি এবং ব্যাঙ্কগুলির সক্রিয় ভূমিকা
সোনার ঋণের বাজার বৃদ্ধিতে ব্যাঙ্ক এবং বিশেষ করে এনবিএফসি-গুলির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। মুথুট ফাইন্যান্স, মানাপ্পুরম ফাইন্যান্সের মতো সংস্থাগুলি দেশজুড়ে তাদের শাখা বিস্তার করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সোনার ঋণের পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের দ্রুত পরিষেবা, আকর্ষণীয় সুদের হার এবং সহজ প্রক্রিয়ার কারণে বহু মানুষ প্রথাগত মহাজনদের ছেড়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলির দিকে ঝুঁকছেন। ব্যাঙ্কগুলিও এখন এই লাভজনক বাজারে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে এবং এনবিএফসি-গুলির সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যার ফলে গ্রাহকরা আরও ভালো শর্তে ঋণ পাচ্ছেন।
বদলে যাওয়া সামাজিক ধারণা
একটা সময় ছিল যখন সোনা বন্ধক রাখা বা বিক্রি করাকে পারিবারিক দুর্দশার লক্ষণ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন সেই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। আজকাল, বহু মানুষ সোনাকে একটি নিষ্ক্রিয় সম্পদ হিসেবে না দেখে, এটিকে একটি স্মার্ট আর্থিক সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সোনা বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া এবং পরে তা পরিশোধ করে ছাড়িয়ে আনা এখন একটি সাধারণ আর্থিক পরিকল্পনা হয়ে উঠেছে। এটিকে এখন আর desesperate times-এর চিহ্ন হিসেবে দেখা হয় না, বরং একটি বুদ্ধিদীপ্ত আর্থিক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রাহকদের মধ্যে এই মানসিকতার পরিবর্তন সোনার ঋণের বাজারকে আরও প্রসারিত করেছে।
প্রযুক্তি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমর্থন
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সোনার ঋণের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে তুলেছে। এখন গ্রাহকরা অনলাইনে ঋণের যোগ্যতা যাচাই করতে পারেন, ঋণের পরিমাণ হিসাব করতে পারেন এবং আবেদনও করতে পারেন। যদিও সোনার ভৌত যাচাইকরণ অপরিহার্য, কিন্তু বাকি প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল হওয়ায় সময় অনেক কম লাগছে। পাশাপাশি, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি এই ক্ষেত্রটিকে আরও স্বচ্ছ এবং সুরক্ষিত করার জন্য বিভিন্ন নিয়মাবলী তৈরি করেছে। লোন-টু-ভ্যালু (LTV) অনুপাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপগুলি গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করেছে।













