রিটার্নের মোহ বনাম ঝুঁকির বাস্তবতা
যেকোনো বিনিয়োগের বিজ্ঞাপনে বড় বড় করে রিটার্নের হার দেখানো হয়। ২০%, ২৫% বা তারও বেশি লাভের গল্প আমাদের সহজেই আকৃষ্ট করে। এই মোহেই অনেক নতুন বিনিয়োগকারী ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তাঁরা ভুলে যান যে,
বেশি লাভের আশার সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে বেশি ঝুঁকি। ওয়ারেন বাফেটের মতো কিংবদন্তী বিনিয়োগকারীর প্রথম নিয়মই হলো— 'কখনো টাকা হারাবেন না' এবং দ্বিতীয় নিয়ম হলো— 'প্রথম নিয়মটি কখনো ভুলবেন না'। এই সহজ কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন। রিটার্ন হলো আপনার উপার্জনের সম্ভাবনা, কিন্তু ঝুঁকি হলো আপনার মূলধন হারানোর আশঙ্কা। যদি আপনার মূলধনই সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে রিটার্ন আসবে কোথা থেকে?
ঝুঁকি আসলে কী? শুধু কি টাকা হারানো?
সাধারণভাবে, ঝুঁকি মানে বিনিয়োগের মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু এর পরিধি আরও ব্যাপক। ঝুঁকি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন— বাজারগত ঝুঁকি (Market Risk), যা পুরো অর্থনীতি বা বাজারের পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয় এবং প্রায় সমস্ত বিনিয়োগকে প্রভাবিত করে। আবার নির্দিষ্ট কোম্পানির পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভরশীল ঝুঁকিও (Business Risk) রয়েছে। এছাড়াও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি (Inflation Risk) একটি বড় চিন্তার কারণ। ধরুন, আপনি এমন কোথাও বিনিয়োগ করলেন যেখানে বার্ষিক ৭% রিটার্ন পাচ্ছেন, কিন্তু সেই বছর মুদ্রাস্ফীতির হার ৮%। এর মানে, আপনার টাকার ক্রয়ক্ষমতা আসলে কমে যাচ্ছে। তাই ঝুঁকি মানে শুধু টাকা হারানো নয়, বরং আপনার আর্থিক লক্ষ্যের থেকে পিছিয়ে পড়াও একটি বড় ঝুঁকি।
মূলধন রক্ষা করাই প্রথম এবং প্রধান কাজ
একজন সফল বিনিয়োগকারীর মূল লক্ষ্য থাকে নিজের মূলধনকে সুরক্ষিত রাখা। কারণ, একবার মূলধনের বড় অংশ হারিয়ে গেলে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া গণিতের নিয়মেই কঠিন হয়ে পড়ে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ধরুন, আপনার ১ লক্ষ টাকার বিনিয়োগ ৫০% কমে গিয়ে ৫০,০০০ টাকায় দাঁড়াল। এখন এই ৫০,০০০ টাকাকে আবার ১ লক্ষ টাকায় ফিরিয়ে আনতে আপনার ১০০% রিটার্নের প্রয়োজন হবে, যা কোনোভাবেই সহজ কাজ নয়। অন্যদিকে, যদি আপনি ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং ১০% ক্ষতিতে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসেন, তাহলে আপনার মূলধন ৯০,০০০ টাকায় দাঁড়াবে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আপনার প্রয়োজন হবে মাত্র ১১.১% রিটার্ন। তাই, বড় লাভের আশায় বড় ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ছোট ছোট নিশ্চিত লাভ এবং নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি অনেক বেশি কার্যকর কৌশল।
ঝুঁকি কমানোর সেরা উপায়: বৈচিত্র্য
“সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখতে নেই”— বিনিয়োগের জগতে এই প্রবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো, আপনার সমস্ত অর্থ একটি মাত্র শেয়ার, একটি সেক্টর বা একটি মাত্র সম্পদে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। একেই বলে পোর্টফোলিও ডাইভারসিফিকেশন বা বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনা। আপনার বিনিয়োগকে বিভিন্ন অ্যাসেট ক্লাস, যেমন— শেয়ার, বন্ড, সোনা এবং রিয়েল এস্টেটে ভাগ করে দিলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। কারণ সাধারণত একটি সেক্টর যখন খারাপ ফল করে, অন্য একটি সেক্টর তখন ভালো ফল করতে পারে। এর ফলে আপনার সামগ্রিক বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে এবং পোর্টফোলিও স্থিতিশীল থাকে।
নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বুঝুন
প্রত্যেক মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বা 'রিস্ক অ্যাপেটাইট' আলাদা হয়। আপনার বয়স, আয়, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং মানসিক দৃঢ়তার ওপর এটি নির্ভর করে। একজন তরুণ, যাঁর সামনে কর্মজীবনের অনেকটা সময় পড়ে আছে, তিনি হয়তো বেশি ঝুঁকি নিতে পারেন। কিন্তু যাঁর ওপর পারিবারিক দায়িত্ব রয়েছে বা যিনি অবসরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, তাঁর জন্য ঝুঁকিহীন বা কম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগই শ্রেয়। অন্যের দেখাদেখি বিনিয়োগ না করে, নিজের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বিনিয়োগ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন— যদি এই বিনিয়োগে ১০% বা ২০% ক্ষতি হয়, আমি কি শান্ত থাকতে পারব? উত্তর যদি 'না' হয়, তবে সেই বিনিয়োগ আপনার জন্য নয়।











