বছরের পর বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাস ও লোককথা
প্রাচীনকাল থেকেই পূর্ণিমাকে নানা অতিপ্রাকৃত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইংরেজি শব্দ 'লুনাসি' (lunacy) বা পাগলামি, লাতিন শব্দ 'লুনা' (lunar) বা চাঁদ থেকে এসেছে। এটিই প্রমাণ করে যে মানুষ চাঁদের দশা, বিশেষত
পূর্ণিমার সঙ্গে মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয় যে, পূর্ণিমার রাতে মানুষের আবেগ তীব্র হয়, অদ্ভুত আচরণ করার প্রবণতা বাড়ে এবং এমনকি অপরাধমূলক কার্যকলাপও বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসক এবং দার্শনিকরাও একসময় বিশ্বাস করতেন যে চাঁদের টানে মানুষের আচরণে পরিবর্তন আসে। এই ধারণা এতটাই শক্তিশালী যে আজও বহু মানুষ মনে করেন, পূর্ণিমার রাতে হাসপাতাল বা থানায় জরুরি অবস্থার সংখ্যা বেড়ে যায়।
ঘুমের ওপর প্রভাব: বিজ্ঞান কী বলছে?
পূর্ণিমার প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে ঘুমের ওপর। একাধিক গবেষণায় একটি হালকা যোগসূত্র পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়ে অংশগ্রহণকারীদের গভীর ঘুম (NREM sleep) ৩০% কমে গিয়েছিল, ঘুম আসতে প্রায় ৫ মিনিট বেশি সময় লেগেছিল এবং মোট ঘুমের সময় প্রায় ২০ মিনিট হ্রাস পেয়েছিল। ২০২১ সালের একটি বৃহত্তর গবেষণায় আর্জেন্টিনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ঘুমের ধরণ ট্র্যাক করা হয়। দেখা গেছে, পূর্ণিমার আগের রাতগুলোতে মানুষ কিছুটা দেরিতে ঘুমাতে যায় এবং তাদের ঘুমের সময়কালও কিছুটা কমে যায়। এই প্রভাবটি সেইসব জায়গায় বেশি দেখা যায় যেখানে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কম। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রাতের উজ্জ্বল চাঁদের আলো আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমকে প্রভাবিত করে। এই আলো মেলাটোনিন নামক ঘুম-সহায়ক হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, যার ফলে মস্তিষ্ক সজাগ থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্য এবং আচরণে কি সত্যিই প্রভাব ফেলে?
যদিও ঘুমের ওপর চাঁদের সামান্য প্রভাবের কিছু প্রমাণ মিলেছে, তবে মানুষের আগ্রাসন, হিংসা বা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর কোনো শক্তিশালী প্রভাবের প্রমাণ মেলেনি। কয়েক দশক ধরে চলা বিভিন্ন গবেষণায় হাসপাতাল বা মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তির হারের সঙ্গে পূর্ণিমার কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯৮৫ সালে প্রায় ১০০টি গবেষণার একটি সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁদের দশা এবং মানুষের আচরণের মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে পূর্ণিমার সময় হত্যাকাণ্ডের হার সামান্য কমে যায়। সুতরাং, পূর্ণিমার রাতে মানুষের অদ্ভুত বা হিংস্র আচরণ করার ধারণাটি মূলত একটি প্রচলিত বিশ্বাস, যার সপক্ষে তেমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাহলে এই বিশ্বাস আজও টিকে আছে কেন?
যদি বিজ্ঞান এই 'লুনার এফেক্ট'-কে সমর্থন না করে, তবে কেন এই বিশ্বাসটি এত দৃঢ়ভাবে টিকে আছে? এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, যাকে বলা হয় 'কনফার্মেশন বায়াস' (confirmation bias) বা সমর্থন পক্ষपात। এর অর্থ হলো, আমরা সেইসব তথ্য বা ঘটনা মনে রাখতে পছন্দ করি যা আমাদের পূর্ববিশ্বাসকে সমর্থন করে। যেমন, যদি কোনো পূর্ণিমার রাতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, আমরা সহজেই তাকে চাঁদের প্রভাব বলে ধরে নিই। কিন্তু অন্য কোনো রাতে একই ঘটনা ঘটলে আমরা তার কোনো বিশেষ কারণ খুঁজি না। এছাড়াও, অতীতে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলো মানুষকে রাতে বেশি সক্রিয় রাখত। এর ফলে দুর্ঘটনা বা মানুষের মধ্যেকার সংঘাতের সম্ভাবনাও হয়তো কিছুটা বাড়ত, যা এই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে।












