বহুল প্রচলিত 'পাঁচ সেকেন্ডের নিয়ম'
বিশ্বজুড়েই 'পাঁচ সেকেন্ডের নিয়ম' (Five-Second Rule) নামে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খাবার মাটিতে বা অপরিষ্কার জায়গায় পড়ে যাওয়ার পর যদি পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে তুলে নেওয়া হয়, তাহলে সেটি
খাওয়ার জন্য নিরাপদ থাকে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এই অল্প সময়ের মধ্যে জীবাণুরা খাবার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ছোট থেকে বড়, অনেকেই এই নিয়মটি বিশ্বাস করেন এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগও করে থাকেন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বা ঘরোয়া পরিবেশে এই ধারণাটির ব্যবহার খুব বেশি দেখা যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন, তখন বেরিয়ে এলো চমকপ্রদ সব তথ্য।
বিজ্ঞান কী বলছে? জীবাণু স্থানান্তরিত হয় মুহূর্তে
বৈজ্ঞানিক গবেষণা 'পাঁচ সেকেন্ডের নিয়ম'কে একটি ভ্রান্ত ধারণা বা মিথ হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা করেন, যা থেকে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে জীবাণু স্থানান্তরিত হতে পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগে না, বরং এটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে। গবেষকরা বলেন, কোনো খাবার একটি দূষিত পৃষ্ঠের সংস্পর্শে আসার এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া খাবারে চলে আসতে পারে। অর্থাৎ, আপনি যত দ্রুতই খাবারটি তুলুন না কেন, জীবাণুর সংক্রমণ আটকানো প্রায় অসম্ভব। যদিও বেশি সময় ধরে পড়ে থাকলে জীবাণুর পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু সংক্রমণ শুরু হয় প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে।
কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে সংক্রমণ?
জীবাণুর সংক্রমণ কত দ্রুত বা কী পরিমাণে হবে, তা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, খাবারের ধরন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসব খাবারে আর্দ্রতা বা জলের পরিমাণ বেশি, যেমন तरমুজ বা মাখন লাগানো রুটি, সেগুলোতে জীবাণু খুব দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে স্থানান্তরিত হয়। তুলনায় শুকনো খাবার, যেমন বিস্কুট বা চিপস, কিছুটা কম জীবাণু শোষণ করে। দ্বিতীয়ত, পৃষ্ঠের ধরনও একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কার্পেটের মতো অমসৃণ পৃষ্ঠ থেকে জীবাণু স্থানান্তরিত হওয়ার হার কম, কারণ কার্পেটের রোঁয়া খাবারের সাথে সরাসরি সংস্পর্শ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, টাইলস, কাঠ বা স্টেইনলেস স্টিলের মতো মসৃণ পৃষ্ঠ থেকে জীবাণু অনেক সহজে এবং দ্রুত খাবারে চলে আসে। সবশেষে, পৃষ্ঠটি কতটা জীবাণুযুক্ত, তার উপরেও সংক্রমণের মাত্রা নির্ভর করে।
ঝুঁকিগুলো কী কী?
মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার খেলে ফুড পয়জনিং বা খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। মেঝে, যা দেখতে পরিষ্কার মনে হতে পারে, সেখানেও ই. কোলাই (E. coli) এবং সালমোনেলার (Salmonella) মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এই ধরনের জীবাণু ডায়রিয়া, বমি, পেট ব্যথা এবং জ্বরের মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব বাড়িতে পোষ্য প্রাণী আছে বা জুতো পরে ঘরে ঢোকা হয়, সেখানকার মেঝেতে জীবাণুর পরিমাণ অনেক বেশি থাকতে পারে। তাই, সামান্য একটি খাবারের জন্য এত বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শিশুদের এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও অনেক বেশি।
তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
যেহেতু 'পাঁচ সেকেন্ডের নিয়ম' বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় এবং এর কোনো ভিত্তি নেই, তাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো মেঝেতে পড়ে যাওয়া যেকোনো খাবার ফেলে দেওয়া। খাবার নষ্ট করাটা খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যের সুরক্ষার চেয়ে বড় কিছু নয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, 'সন্দেহ থাকলে, ফেলে দিন' (when in doubt, throw it out)। আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবাণুরা অদৃশ্য। একটি পৃষ্ঠকে পরিষ্কার দেখালেও তা জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে। খাওয়ার আগে সবসময় হাত ধোয়া, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চলাই খাদ্যবাহিত রোগ থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায়। পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়ার লোভ সামলে নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়াই শ্রেয়।










