কেন শিক্ষকদের উপর এই বাড়তি দায়িত্ব?
জনগণনা বা নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য একটি বিশাল এবং নির্ভরযোগ্য কর্মী বাহিনীর প্রয়োজন হয়। সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা দেশজুড়ে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের অংশ এবং শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে
পরিচিত। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, তাঁদের সহজে সংগঠিত করা যায় এবং তাঁদের উপর দায়িত্ব অর্পণ করা সুবিধাজনক। প্রায়শই দেখা যায়, কম খরচে এবং দ্রুত এই ধরনের জাতীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসন শিক্ষকদের উপর নির্ভর করে। সম্প্রতি কলকাতা পৌর নিগম (KMC) আসন্ন জনগণনার কাজে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছে। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ কর্মীসংকটের কারণ দেখিয়ে শিক্ষক ছাড়তে অপারগতা প্রকাশ করলেও প্রশাসন আইন দেখিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে।
আইন কী বলছে?
শিশুদের শিক্ষার অধিকার আইন, ২০০৯ (RTE Act) অনুযায়ী, শিক্ষকদের শিক্ষাদান বহির্ভূত কাজে নিয়োগ করার উপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই আইনের ২৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, দশ বছর অন্তর জনগণনা, বিপর্যয় মোকাবিলা এবং স্থানীয় বা বিধানসভা/লোকসভা নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো অশিক্ষামূলক কাজে শিক্ষকদের নিযুক্ত করা যাবে না। আইন অনুযায়ী জনগণনার কাজে শিক্ষকদের নিয়োগ করা গেলেও, প্রশ্ন উঠছে এর সময়সীমা এবং শিক্ষাদানের উপর তার প্রভাব নিয়ে। শিক্ষক সংগঠনগুলির দাবি, যখন দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে ক্লাস বন্ধ থাকে বা কর্মীসংকট চলে, তখন এই ধরনের অতিরিক্ত দায়িত্ব সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতি করে। তাঁদের মতে, এই কাজগুলি এমনভাবে পরিচালনা করা উচিত যাতে শিক্ষাদানের সময় নষ্ট না হয়।
ক্লাসরুমে সরাসরি প্রভাব
শিক্ষকদের জনগণনার মতো কাজে নিযুক্ত করার সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে ক্লাসরুমে। শিক্ষকরা যখন স্কুলের বাইরে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে সিলেবাস সময়মতো শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে দশম বা দ্বাদশ শ্রেণির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসে, যেখানে বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি চলে। অনেক স্কুলেই শিক্ষকের অভাব রয়েছে, যার ফলে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হয়। এই পরিস্থিতিতে যদি অতিরিক্ত দায়িত্ব এসে পড়ে, তাহলে পড়াশোনার মান বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকদের যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এবং তাদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকে, তাও ব্যাহত হয়।
শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
শিক্ষকতা একটি মানসিক শ্রমনির্ভর পেশা। পাঠদানের প্রস্তুতির পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও দেখতে হয়। এর উপর যখন জনগণনা, ভোটার তালিকা সংশোধন বা মিড-ডে মিলের মতো অতিরিক্ত কাজের চাপ আসে, তখন শিক্ষকরা মানসিক এবং শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই ধরনের কাজ প্রায়শই ছুটির দিনে বা স্কুলের সময়ের বাইরেও করতে হয়, যা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে। ক্রমাগত অশিক্ষামূলক কাজে নিযুক্ত থাকা তাঁদের পেশাগত পরিচয়ের সংকট তৈরি করে এবং শিক্ষকতার প্রতি উৎসাহ কমিয়ে দেয়। সেন্সাস অ্যাক্ট, ১৯৪৮ অনুযায়ী, দায়িত্ব এড়ালে জরিমানা বা কারাদণ্ডের মতো শাস্তির বিধান থাকায় শিক্ষকরা একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই কাজ করেন, যা তাঁদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে তোলে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি কী হতে পারে?
এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রথমত, সরকারি স্কুলগুলির শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। যখন পড়ুয়ারা দেখবে যে স্কুলে নিয়মিত ক্লাস হয় না, তখন তাদের স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা বাড়বে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকরা সরকারি স্কুলের প্রতি আস্থা হারিয়ে বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকবেন, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়াবে। শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশের মতে, এটি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে বেসরকারি শিক্ষাকে উৎসাহিত করার একটি পরোক্ষ কৌশল। তৃতীয়ত, যে ছাত্রছাত্রীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাদের উচ্চশিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে আগামী দিনে দক্ষ এবং শিক্ষিত নাগরিকের অভাব দেখা দিতে পারে, যা রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
তাহলে বিকল্প পথ কী?
শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষক সংগঠনগুলি বারবার বিকল্প পথের কথা বলেছে। তাঁদের মতে, জনগণনা বা এই জাতীয় কাজের জন্য শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের একটি অস্থায়ী কর্মী বাহিনী হিসেবে নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, তেমনই শিক্ষকদের তাঁদের মূল কাজ, অর্থাৎ পাঠদানে মনোনিবেশ করার সুযোগ দেওয়া যাবে। প্রশাসন চাইলে একটি পৃথক বিভাগ তৈরি করতে পারে, যারা এই ধরনের প্রশাসনিক কাজগুলি পরিচালনা করবে। মূল প্রশ্নটি হলো সদিচ্ছার। শিক্ষাকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখলে এবং শিক্ষকদের শুধুমাত্র শিক্ষাদানের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখলে একটি শিক্ষিত ও উন্নত সমাজ গঠন সম্ভব।













