মেসির পরিবর্তিত ভূমিকা বোঝা
লিওনেল মেসিকে আটকানোর প্রথম ধাপ হলো তার বর্তমান খেলার ধরন বোঝা। আগের মতো তিনি কেবল একজন গোল স্কোরার নন, বরং এখন তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল স্থপতি। প্রায়শই তিনি মাঠের ডান দিক থেকে খেলা শুরু করেন, তবে
খেলার প্রয়োজনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড বা ফলস নাইন হিসেবেও আবির্ভূত হন। তিনি এখন খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেন। তাই স্পেনকে শুধু তার গোল করা আটকালে চলবে না, পুরো দলের ওপর তার প্রভাব কমাতেও নজর দিতে হবে। মেসি এখন অনেক সময় নিয়ে মাঠে হাঁটেন, যা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য একধরনের ফাঁদ। এই ধীর গতি ডিফেন্ডারদের মনোযোগ নষ্ট করে এবং হঠাৎ এক বিস্ফোরণে তিনি রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলেন। তাই স্পেনের ডিফেন্ডারদের পুরো ৯০ মিনিট মনোযোগী থাকতে হবে।
মাঝমাঠের দখল: সাপ্লাই লাইন বিচ্ছিন্ন করা
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মাঝমাঠ। রদ্রি, পেদ্রি এবং গাভির মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া এই মিডফিল্ড বল দখলে রেখে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মেসিকে আটকানোর অন্যতম সেরা উপায় হলো তার কাছে বল পৌঁছানোর রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া। ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ যেমনটা বলেছিলেন, মেসির জাদু দেখতে না চাইলে তার পায়ে বল যেতে দেওয়া যাবে না। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলও একই ধরনের হতে পারে। রদ্রিকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ব্যবহার করে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার যেমন রদ্রিগো দি পল বা এনজো ফার্নান্দেজের পাসিং লেন বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। যদি মেসি বলের জন্য নিচে নেমে আসে, স্পেনের মিডফিল্ডাররা তাকে প্রেস করে খেলা কঠিন করে তুলবে। এর ফলে আর্জেন্টিনা তাদের মূল প্লেমেকারকে ব্যবহার করতে হিমশিম খাবে।
ম্যান-মার্কিং বনাম জোনাল ডিফেন্ডিং
মেসির মতো খেলোয়াড়কে ম্যান-মার্কিং করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তিনি সহজেই মার্কারকে বোকা বানিয়ে অন্য খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারেন। তাই একজন নির্দিষ্ট ডিফেন্ডারকে তার পেছনে লাগিয়ে দেওয়ার বদলে স্পেন সম্ভবত জোনাল মার্কিং পদ্ধতি বেছে নেবে। এই পদ্ধতিতে মেসি যখন যে জোনে যাবেন, সেই জোনের দায়িত্বে থাকা স্প্যানিশ খেলোয়াড় তাকে মার্ক করবেন। এর জন্য ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডারদের মধ্যে দুর্দান্ত বোঝাপড়া প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, মেসি যখন ডান দিক থেকে ভেতরে আসবেন, তখন স্পেনের লেফট-ব্যাক, লেফট-সেন্টার ব্যাক এবং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার—এই তিনজনের মধ্যে সমন্বয় করে তাকে আটকাতে হবে। এর ফলে স্পেনের রক্ষণভাগ নিজেদের পজিশন থেকে সরে গিয়ে বিশৃঙ্খল হবে না।
কমপ্যাক্ট ডিফেন্সিভ শেপ ও নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে দলকে একটি কমপ্যাক্ট ৪-৫-১ বা ৪-১-৪-১ ফর্মেশনে খেলান, যা প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠে কোনো জায়গা দেয় না। আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও এই কৌশল দেখা যেতে পারে। রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে এনে স্পেন মেসিকে খেলার জন্য কোনো পকেট স্পেস দেবে না। যখনই মেসি বল পাবেন, তাকে দ্রুত ঘিরে ধরে প্রেস করা হবে, যাতে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে বা পাস দেওয়ার সময় না পান। তবে এই আগ্রাসন হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। বক্সের আশেপাশে অপ্রয়োজনীয় ফাউল করা মানে মেসিকে তার ভয়ঙ্কর ফ্রিকিকের সুযোগ দেওয়া। স্পেনের ডিফেন্ডারদের ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ নিতে হবে, তবে সেটা নিয়মের মধ্যে থেকেই। উদ্দেশ্য হবে মেসির ছন্দ নষ্ট করা, তাকে আহত করা নয়।
স্পেনের আক্রমণই সেরা রক্ষণ?
অনেক সময় সেরা রক্ষণ হলো প্রতিপক্ষকে আক্রমণে ব্যস্ত রাখা। স্পেন বল দখলে রেখে খেলতে ভালোবাসে এবং তাদের দলে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো দ্রুতগতির উইঙ্গার রয়েছে। এই দুই উইঙ্গারকে ব্যবহার করে স্পেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখতে পারে। যদি স্পেনের ফুল-ব্যাকরা আক্রমণে উঠে যায় এবং ইয়ামাল ও উইলিয়ামস ক্রমাগত আর্জেন্টাইন রক্ষণকে চাপে রাখে, তবে মেসি রক্ষণাত্মক কাজে বেশি সময় দিতে বাধ্য হবেন। এতে তার আক্রমণাত্মক প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসবে। স্পেন যদি খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে পারে এবং আর্জেন্টিনাকে রক্ষণাত্মক হতে বাধ্য করে, তবে মেসিকে আটকানোর অর্ধেক কাজ সেখানেই হয়ে যাবে।










