ফুটবলের এই ঠিকানা কোথায়?
কলকাতার ধর্মতলা অঞ্চলের কাছে অবস্থিত ময়দান মার্কেট সংলগ্ন এলাকাটিই কয়েক দশক ধরে ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রধান আকর্ষণ। তবে এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা মূলত ফুটবল সরঞ্জাম এবং জার্সির জন্য বিখ্যাত, সেটিই
আজ 'ফিফা গলি' নামে পরিচিতি পেয়েছে। আদতে এটি কোনও সরকারি নাম নয়, বরং ফুটবলপ্রেমীদের দেওয়া এক আদরের ডাকনাম। এই গলিতে ঢুকলে মনে হবে যেন এক ফুটবল কার্নিভালে এসে পড়েছেন। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড— বিশ্বের তাবড় তাবড় ক্লাব ও দেশের জার্সি, পতাকা, স্কার্ফ আর ফুটবলের রঙিন পসরা সাজানো দোকানগুলিতে। বিশ্বকাপের সময় এই গলির রূপ হয় দেখার মতো।
নামকরণের পেছনের গল্প
এই এলাকার সঙ্গে ফুটবলের যোগসূত্র বহুদিনের, তবে 'ফিফা গলি' নামটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে মূলত একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে। বিশেষ করে ২০০২ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সময় থেকে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, আগে এখানে মূলত জামাকাপড়ের ব্যবসাই হত। কিন্তু বিশ্বকাপের উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক দলগুলির জার্সির চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। সেই চাহিদা মেটাতে গিয়েই ময়দান মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশের রেপ্লিকা জার্সি বিক্রি শুরু করেন। ফিফা বিশ্বকাপের সময় এই গলিতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। পছন্দের দলের জার্সির খোঁজে শহর ও শহরতলির ফুটবলপ্রেমীরা এখানে ভিড় জমান। ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে 'ফিফা গলি' নামটি পাকাপাকিভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শুধু ব্যবসা নয়, এ এক আবেগের বিবর্তন
কলকাতাকে 'ভারতীয় ফুটবলের মক্কা' বলা হয়। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল এবং মোহামেডান স্পোর্টিং-এর মতো শতাব্দী প্রাচীন ক্লাবের ইতিহাস এই শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই ফুটবল আবেগকেই পুঁজি করে ময়দান মার্কেট নিজেকে বদলে ফেলেছে। একটা সময় ছিল যখন শুধুমাত্র স্থানীয় ক্লাবের জার্সি বা ফুটবলই পাওয়া যেত। কিন্তু বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানকার ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন যে, কলকাতার ফুটবলপ্রেম শুধু ঘটি-বাঙালের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। মারাদোনা থেকে মেসি, রোনাল্ডো থেকে নেইমার— বিদেশি তারকাদের প্রতিও বাঙালির ভালোবাসা আকাশছোঁয়া। সেই ভালোবাসা আর আবেগকে সম্মান জানিয়েই এই গলি আজ বিশ্ব ফুটবলের এক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। সাধ্যের মধ্যে পছন্দের তারকার জার্সি কিনে সমর্থকরা নিজেদের ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের অংশ করে তোলেন।
বিশ্বজোড়া খ্যাতি এলো যেভাবে
একটা সময় পর্যন্ত 'ফিফা গলি'র খ্যাতি মূলত কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত এক দশকে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে ডিজিটাল মিডিয়া এবং পর্যটকরা। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই গলির উপর প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ইউটিউবার, ভ্লগার এবং পর্যটকরা এখানকার রঙিন পরিবেশের ছবি এবং ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার ফলে এর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে, উত্তর কলকাতার ফকির চক্রবর্তী লেনের মতো পাড়াগুলিও বিশ্বকাপের সময় নিজেদের উদ্যোগে সেজে ওঠে এবং 'ফিফা গলি'র পরিপূরক হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে যা ছিল দেওয়ালে সংবাদপত্রের কাটিং লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা আজ বড় বড় ম্যুরাল এবং কাটআউটে পরিণত হয়েছে। এই স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপনই ফিফা গলির আসল আকর্ষণ, যা কোনও স্পনসরশিপের উপর নির্ভরশীল নয়, কেবল ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়
ভারতে ক্রিকেট জাতীয় অবসেশন হলেও, কলকাতা এমন এক শহর যেখানে ফুটবল নিছকই একটি খেলা নয়, বরং এটি এখানকার মানুষের পরিচয়, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফিফা গলি সেই সংস্কৃতিরই এক জীবন্ত প্রদর্শনী। এখানে শুধু জার্সি বিক্রি হয় না, এখানে বিনিময় হয় আবেগ, তর্ক-বিতর্ক আর অফুরন্ত ফুটবলীয় স্মৃতি। কম খরচে সেরা মানের রেপ্লিকা জার্সি কেনার সুযোগ থাকায় সমাজের সব স্তরের মানুষ এখানে আসেন। বিশ্বকাপের সময় বাবা-ছেলে একসঙ্গে নিজেদের পছন্দের দলের জার্সি কেনেন, বন্ধুরা মিলে পতাকা ওড়ান— এই দৃশ্যগুলোই ফিফা গলির প্রাণ। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে কীভাবে একটি স্থানীয় বাজার বিশ্বজনীন আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।










