কেন বিজ্ঞানীদের এই সতর্কতা?
আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চল পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তুলনায় প্রায় চারগুণ দ্রুত গরম হচ্ছে। এই ঘটনাকে বলা হয় 'আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন'। এর ফলে সেখানকার বরফ, যা হাজার হাজার বছর ধরে স্থিতিশীল ছিল, তা এখন
অভূতপূর্ব গতিতে গলছে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দশকে আর্কটিকের গ্রীষ্মকালীন সামুদ্রিক বরফের পরিমাণ প্রায় ১৩ শতাংশ হারে কমছে। এই বরফ পৃথিবীর জন্য একটি প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনারের মতো কাজ করে। সূর্যের আলো ও তাপ সাদা বরফে প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়, যা পৃথিবীকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু বরফ গলে গিয়ে যখন गहरे নীল সমুদ্র বেরিয়ে আসে, তখন সেই সমুদ্র আরও বেশি তাপ শোষণ করে। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত হতে থাকে, যা এক ভয়ংকর চক্র তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এই চক্র নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত।
দুই ধরনের বরফ, দুই রকম বিপদ
আর্কটিকের বরফ গলার বিষয়টি বুঝতে হলে দুই ধরনের বরফের পার্থক্য জানা জরুরি। প্রথমটি হলো সামুদ্রিক বরফ, যা সমুদ্রের জল জমে তৈরি হয়। এই বরফ গললে সরাসরি সমুদ্রের জলস্তর বাড়ে না, ঠিক যেমন গ্লাসের মধ্যে থাকা বরফ গলে গেলে গ্লাসের জল উপচে পড়ে না। কিন্তু এর প্রভাব পরোক্ষ। সামুদ্রিক বরফ না থাকলে সূর্যের তাপ বেশি শোষিত হয়, যা আর্কটিককে আরও গরম করে তোলে। দ্বিতীয় এবং আরও ভয়ঙ্কর হলো স্থলভাগের বরফ, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তর। এটি একটি বিশাল মহাদেশীয় হিমবাহ। এই বরফ যখন গলে সমুদ্রের জলে মেশে, তখন সরাসরি সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তর যদি পুরোপুরি গলে যায়, তাহলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের জলস্তর প্রায় ৭ মিটার বা ২৩ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা পৃথিবীর উপকূলীয় শহরগুলোর জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
‘জোম্বি আইস’ এবং এক অবশ্যম্ভাবী বিপদ
সাম্প্রতিক গবেষণায় ‘জোম্বি আইস’ নামক একটি নতুন আতঙ্ক সামনে এসেছে। এটি গ্রিনল্যান্ডের সেই বরফ, যা মূল বরফস্তর থেকে পুষ্টি বা তুষারপাত পাচ্ছে না, কিন্তু এখনও গলেনি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বরফটি ইতিমধ্যেই ‘মৃত্যুর পথে’। একে বাঁচানোর আর কোনো উপায় নেই, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে এর গলে যাওয়া নিশ্চিত। এই ‘জোম্বি আইস’ গলার ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের জলস্তর অন্তত ১০.৬ ইঞ্চি বাড়বে, যা আগের পূর্বাভাসের প্রায় দ্বিগুণ। সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, বিশ্ব যদি আজ থেকেই সব কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়, তাহলেও এই জলস্তর বৃদ্ধিকে আটকানো যাবে না। এটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সেই ‘টিপিং পয়েন্ট’ বা необратиব বিন্দু, যা আমরা হয়তো ইতিমধ্যেই পার করে ফেলেছি।
ভারতের উপর এর প্রভাব কতটা?
অনেকেই ভাবতে পারেন, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের আর্কটিকের বরফ গলার সাথে ভারতের কী সম্পর্ক? সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর। প্রথমত, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে ভারতের প্রায় ৭,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা সরাসরি বিপদের মুখে। কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, কোচিসহ একাধিক বড় শহর এবং সুন্দরবনের মতো নিচু অঞ্চল আংশিকভাবে বা পুরোপুরি জলের তলায় চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আর্কটিকের উষ্ণায়ন জেট স্ট্রিম বা বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের বায়ুপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। এই জেট স্ট্রিম ভারতের মৌসুমী বায়ুকে নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর গতিপথ বদলে গেলে মৌসুমী বায়ু অনিয়মিত হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে কখনও চরম খরা, আবার কখনও ভয়াবহ বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বাড়তে পারে, যা দেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
শুধু সতর্কতা নয়, প্রয়োজন পদক্ষেপের
আর্কটিকের বরফ গলা নিছক একটি পরিবেশগত ঘটনা নয়, এটি একটি বিশ্বজনীন সংকট যা মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বরফ গলার পাশাপাশি সেখানকার পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত মাটি গলে গিয়ে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে, যা কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়েও শক্তিশালী একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। এই ঘটনাগুলো পৃথিবীকে আরও দ্রুত গরম করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা শুধু বিপদঘণ্টাই বাজাচ্ছেন না, তারা সমাধানের দিকেও ইঙ্গিত করছেন। কার্বন নিঃসরণ কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করে নবায়নযোগ্য শক্তিতে স্থানান্তর, এবং বনভূমি রক্ষা করাই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ। এই পদক্ষেপগুলো কেবল সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্ব নয়, ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনাও সমানভাবে জরুরি।













