মাইক্রোওয়েভ কীভাবে কাজ করে?
প্রথমেই বোঝা দরকার, মাইক্রোওয়েভ কীভাবে খাবার গরম করে। এই যন্ত্রটি বিদ্যুৎ শক্তিকে ক্ষুদ্র, উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও তরঙ্গে (মাইক্রোওয়েভ) রূপান্তরিত করে। এই তরঙ্গগুলো খাবারের ভেতরে থাকা জলের অণুগুলোকে
দ্রুতগতিতে কাঁপিয়ে তোলে। অণুগুলোর এই কম্পনের ফলে ঘর্ষণ তৈরি হয় এবং সেই ঘর্ষণ থেকেই তাপ উৎপন্ন হয়, যা খাবারকে ভেতর থেকে গরম করে তোলে। [10] এই প্রক্রিয়ায় খাবারের ডিএনএ বা রাসায়নিক গঠনে কোনো ক্ষতিকর পরিবর্তন হয় না এবং খাবারটি তেজস্ক্রিয়ও হয়ে যায় না। [17] বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাইক্রোওয়েভের সুইচ বন্ধ করার সাথে সাথেই এর রেডিয়েশনও বন্ধ হয়ে যায়, তাই এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। [19]
মূল প্রশ্ন: পুষ্টিগুণ কি সত্যিই নষ্ট হয়?
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো, মাইক্রোওয়েভ খাবারের সব পুষ্টিগুণ "নষ্ট" করে দেয়। সত্যিটা হলো, যেকোনো ধরনের রান্নাতেই তাপের কারণে কিছু পরিমাণ পুষ্টিগুণ কমে যায়। [2] আসল বিষয় হলো রান্নার সময়, তাপমাত্রা এবং ব্যবহৃত জলের পরিমাণ। হার্ভার্ড হেলথ-এর মতে, যে পদ্ধতিতে সবচেয়ে কম সময়ে এবং সবচেয়ে কম জল ব্যবহার করে রান্না করা যায়, সেই পদ্ধতিতেই পুষ্টিগুণ সবচেয়ে বেশি সংরক্ষিত থাকে। [3] মাইক্রোওয়েভ ঠিক এই কাজটিই করে। এতে খাবার খুব দ্রুত রান্না হয় এবং জল প্রায় লাগে না বললেই চলে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত রান্নার চেয়ে মাইক্রোওয়েভে পুষ্টিগুণ বেশি অটুট থাকে। [2, 10]
অন্যান্য রান্নার পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা
মাইক্রোওয়েভের কার্যকারিতা বুঝতে অন্য পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা জরুরি। যেমন, সবজি সেদ্ধ করার সময় জলে দ্রবণীয় ভিটামিন, যেমন—ভিটামিন সি এবং বি কমপ্লেক্স, অনেকটাই জলের সঙ্গে বেরিয়ে যায় এবং সেই জল আমরা ফেলেই দিই। [3, 9] গবেষণায় দেখা গেছে, সেদ্ধ করা ব্রকোলি তার ক্যান্সার-প্রতিরোধী যৌগ গ্লুকোসিনোলেট হারিয়ে ফেলে, যা স্টিম বা মাইক্রোওয়েভ করলে অনেকটাই সংরক্ষিত থাকে। [3, 8] ভাজা বা দীর্ঘক্ষণ ধরে কড়াইয়ে রান্না করার ফলে উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে খাবারের অনেক পুষ্টি নষ্ট হয়। এর তুলনায়, মাইক্রোওয়েভে কম সময়ে রান্না হওয়ায় ভিটামিন সি-এর মতো তাপ-সংবেদনশীল ভিটামিনগুলো বেশি পরিমাণে টিকে থাকে। [4, 11]
কোন খাবারের জন্য মাইক্রোওয়েভ বেশি উপযোগী?
শাকসবজি গরম করা বা রান্নার জন্য মাইক্রোওয়েভ অন্যতম সেরা উপায়। [4] খুব সামান্য জল ছিটিয়ে বা জল ছাড়াই সবজি মাইক্রোওয়েভে 'স্টিম' করলে এর রঙ, স্বাদ এবং পুষ্টি উপাদান, বিশেষ করে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো অক্ষুণ্ণ থাকে। [4] পালং শাকের মতো সবজি মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে এর ফোলেট প্রায় পুরোটাই থেকে যায়, যেখানে চুলার উপর রান্না করলে প্রায় ৭৭% নষ্ট হয়ে যেতে পারে। [5] তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও দেখা যায়; যেমন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোওয়েভ করা ব্রকোলিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ কমে গিয়েছিল, যেখানে স্টিম করায় তা কমেনি। [5] তাই বলা যায়, রান্নার সময় এবং পদ্ধতি খাবারের ধরনের ওপরও নির্ভর করে।
ঝুঁকি কোথায়? আসল যেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন
মাইক্রোওয়েভের পুষ্টিগুণ নিয়ে যতটা চর্চা হয়, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানা। মূল ঝুঁকিটি মাইক্রোওয়েভের নয়, বরং আমরা যে পাত্র ব্যবহার করি, তার। [18] সাধারণ বা নিম্নমানের প্লাস্টিকের পাত্র মাইক্রোওয়েভের তাপে গলে গিয়ে বিপিএ (BPA) এবং থ্যালেটস (Phthalates)-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারে মিশিয়ে দিতে পারে। [20] এই রাসায়নিকগুলো হরমোনের সমস্যা, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সবসময় 'মাইক্রোওয়েভ-সেফ' লেবেলযুক্ত কাঁচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা উচিত। [18] এছাড়াও, খাবার যাতে সবদিকে সমানভাবে গরম হয়, সেজন্য মাঝে মাঝে নেড়ে দেওয়া ভালো। কারণ অসম গরমের ফলে খাবারের কিছু অংশে জীবাণু থেকে যেতে পারে। [19]












