বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: মিশর বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ
এবারের বিশ্বকাপে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে শেষ ষোলোর আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচটি। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্যভাবে ৩-২ গোলে জয়লাভ করে। কিন্তু এই ম্যাচের
দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রথমে, মিশরের একটি গোল ভার (VAR) প্রযুক্তির সাহায্যে বাতিল করা হয়। সমালোচকদের মতে, গোলটি বাতিল করার জন্য যে ফাউলের আশ্রয় নেওয়া হয়, তা ঘটেছিল প্রায় ২০ সেকেন্ড আগে এবং মাঠের অন্য প্রান্তে। দ্বিতীয়ত, ম্যাচের শেষদিকে মিশরের একটি পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়, যা তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে। মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে এবং ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরকে প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কারের দাবি জানায়। যদিও ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা রেফারিংয়ের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে দাবি করেছেন।
কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালেও বিতর্ক
বিতর্ক শুধু মিশর ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেও একটি ঘটনা ঘটে যা অনেকের চোখেই অদ্ভুত ঠেকে। রেফারি প্রথমে আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখালেও, ভার পর্যালোচনার পর সেই কার্ড তুলে নিয়ে সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোকে ‘ডাইভিং’-এর জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া সুইজারল্যান্ড ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়। এরপর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেও রেফারির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা একাধিক ফাউল করলেও মাত্র একটি হলুদ কার্ড দেখানো হয়, যা ইংরেজ সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করে। স্বয়ং লিওনেল মেসিকেও ম্যাচ শেষে এই বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
অভিযোগ যখন পরিসংখ্যানের, তখন তথ্য কী বলছে তা দেখাও জরুরি। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, শেষ ষোলো পর্যন্ত ভার (VAR) প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়া দলগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় স্থানে ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, এই পর্যায় পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটিও ভার সিদ্ধান্ত যায়নি। অর্থাৎ, যখনই ভার প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে, সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষেই গেছে বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত বদলানো হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনা মোট ১৬টি গোল করে এবং মাত্র ৪টি গোল হজম করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা আক্রমণ ও রক্ষণ তাদেরই ছিল। তবে ভার-এর একপেশে সুবিধা পাওয়ার পরিসংখ্যানই পক্ষপাতিত্বের বিতর্ককে জিইয়ে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞ ও খেলোয়াড়দের মতামত
এই বিতর্ক নিয়ে ফুটবল বিশ্ব কার্যত দু'ভাগে বিভক্ত। মিশরের কোচ হোসাম হাসান এবং খেলোয়াড়রা সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে টুর্নামেন্টটি আর্জেন্টিনার জন্য পাতানো হয়েছে। অনেক প্রাক্তন রেফারি এবং ফুটবল বিশেষজ্ঞ, যেমন মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ, মনে করেন যে কিছু সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে মিশরের গোল বাতিলের বিষয়টি খেলার নিয়মের ભાવনার পরিপন্থী ছিল। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি এই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, তাদের অর্জন সম্পূর্ণ মাঠের পারফরম্যান্সের ফল, কোনো পক্ষপাতিত্বের নয়। সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিনও মনে করেন যে আজকাল ভার প্রযুক্তির কারণে ম্যাচগুলো যথেষ্ট ন্যায্যভাবেই পরিচালিত হয় এবং মাঠের লড়াইটাই আসল।












