এক অবিশ্বাস্য রেকর্ডের জন্ম
ফুটবল বিশ্ব একজন নতুন রাজার সাক্ষী হলো। ২০২২ বিশ্বকাপে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। চার বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপেও নিজের ফর্ম ধরে রেখে তিনি ১০টি গোল করে আবারও সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। বিশ্বকাপের
৯৬ বছরের ইতিহাসে এর আগে কোনো খেলোয়াড়ই টানা দুটি টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে পারেননি। এই অবিশ্বাস্য কীর্তি এমবাপেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা পেলে, মারাদোনা, রোনালদো নাজারিও বা গার্ড মুলারের মতো কিংবদন্তিরাও করে দেখাতে পারেননি।
গোল্ডেন বুটের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ফিফা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাকে গোল্ডেন বুট পুরস্কার দেওয়া হয়। যদিও প্রতিটি বিশ্বকাপেই সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকা করা হতো, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় ১৯৮২ সাল থেকে, তখন এর নাম ছিল 'গোল্ডেন শু'। ২০১০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে 'গোল্ডেন বুট' রাখা হয়। ইউসেবিও, গার্ড মুলার, পাওলো রসি, রোনালদো নাজারিও, মিরোস্লাভ ক্লোসার মতো কিংবদন্তিরা এই পুরস্কার জিতেছেন। কিন্তু কেউই পর পর দুবার জিততে পারেননি। এমবাপে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই পুরস্কার দুবার জিতলেন।
কেন এই কীর্তি এত বিরল?
টানা দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এর প্রধান কারণ হলো ফর্ম ধরে রাখা। একজন ফুটবলারের জীবনে সেরা ফর্ম খুব অল্প সময়ের জন্য আসে। চার বছরের ব্যবধানে দুটি বিশ্বকাপে শারীরিক ও মানসিক ভাবে শীর্ষে থাকা অত্যন্ত কঠিন। এর সাথে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ, নতুন কৌশল এবং উদীয়মান তারকাদের চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। এছাড়া, দলের পারফরম্যান্সের ওপরও একজন খেলোয়াড়ের গোল করা অনেকাংশে নির্ভর করে। দল যদি নকআউট পর্বের শুরুর দিকেই বিদায় নেয়, তাহলে গোল্ডেন বুট জেতার সুযোগ কমে যায়। এসব কারণেই এমবাপের এই অর্জন এতটা ব্যতিক্রমী।
সর্বকালের সেরাদের তালিকায় এমবাপে
২০২৬ বিশ্বকাপে ১০ গোল করার মাধ্যমে এমবাপের মোট বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা এখন ২২। এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে এই রেকর্ড গড়া এককথায় অভাবনীয়। তার সামনে এখনও অন্তত একটি বা দুটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ রয়েছে। পেলের তিনটি বিশ্বকাপ জয় বা মারাদোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জেতানোর মতো অর্জনগুলো এখনও তার সামনে মাইলফলক হিসেবে রয়েছে। তবে গোলদাতা হিসেবে তিনি যে এরই মধ্যে নিজেকে সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি এক বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোল করার কীর্তিও গড়লেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নতুন ইতিহাস
টানা দুটি গোল্ডেন বুট এবং বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, এমবাপের দৌড় থামবে কোথায়? তার গোল করার ক্ষমতা, গতি এবং বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠার মানসিকতা তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলে হেরে গেলেও এমবাপের জোড়া গোলই তাকে গোল্ডেন বুট জিতিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, দলের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ইতিহাস গড়ার সামর্থ্য তার রয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন থেকেই ২০৩০ বিশ্বকাপের অপেক্ষায় থাকবেন, যেখানে হয়তো এমবাপের হাত ধরে আরও নতুন কোনো ইতিহাস লেখা হবে।






