ভৌগোলিক অবস্থান ও ফানেল-আকৃতি
বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় প্রবণ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর ভৌগোলিক গঠন। এটি তিন দিক থেকে স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত, যা একটি ফানেলের মতো আকৃতি তৈরি করে। এই গঠনের ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় তৈরি হওয়া জলীয় বাষ্পপূর্ণ
বাতাস সহজে অন্য দিকে যেতে পারে না এবং সাগরের মধ্যেই শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। যখন ঘূর্ণিঝড় উপকূলের দিকে এগোয়, এই ফানেল আকৃতির জন্য জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা বহুগুণ বেড়ে যায়, যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। আবহাওয়াবিদরা এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
উষ্ণ জলস্তর এবং অফুরন্ত আর্দ্রতা
ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য সমুদ্রের জলের উষ্ণতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অন্তত ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় সারাবছরই ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, যা ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ। অন্যদিকে, আরব সাগরের জল অপেক্ষাকৃত শীতল থাকে। এছাড়াও, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো বড় নদীগুলোর বিপুল পরিমাণ মিষ্টি ও উষ্ণ জল বঙ্গোপসাগরে মেশে। এই মিষ্টি জল সমুদ্রের নোনা জলের ওপর একটি স্তর তৈরি করে, যা নীচের শীতল জলকে ওপরে আসতে বাধা দেয় এবং পৃষ্ঠের উষ্ণতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই উষ্ণ জলস্তর এবং প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি জোগায়।
দুর্বল উইন্ড শিয়ার এবং ঘূর্ণাবর্ত
ঘূর্ণিঝড় ভালোভাবে তৈরি ও সংগঠিত হওয়ার জন্য বাতাসের উল্লম্ব গতিবেগের পার্থক্য বা 'উইন্ড শিয়ার' কম থাকা দরকার। উইন্ড শিয়ার বেশি হলে ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন গতি ব্যাহত হয় এবং এটি শক্তিশালী হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে। বঙ্গোপসাগরে আরব সাগরের তুলনায় উইন্ড শিয়ার কম থাকে, যা ঘূর্ণিঝড়কে সংগঠিত হতে এবং শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও, অনেক সময় প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া টাইফুনের অবশিষ্টাংশ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে এবং ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। আরব সাগরে এমন بیرونی প্রভাবের সুযোগ কম।
আরব সাগরের তুলনায় পরিসংখ্যান
ঐতিহাসিকভাবে, বঙ্গোপসাগরে আরব সাগরের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে ঘূর্ণিঝড়ে মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই এই অঞ্চলে ঘটে, যদিও বিশ্বের মাত্র ৬ শতাংশ ঘূর্ণিঝড় এখানে তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ১৯০টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছিল, যেখানে আরব সাগরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৩। বিশ্বের ৩৫টি সবচেয়ে বিধ্বংসী মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ২৬টিই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭০ সালের ভোলার ঘূর্ণিঝড় অন্যতম, যাতে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, যা ঘূর্ণিঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড়গুলো আরও বেশি আর্দ্রতা ধারণ করছে এবং তাদের তীব্রতাও বাড়ছে। যদিও বঙ্গোপসাগর ঐতিহাসিকভাবেই বেশি ঘূর্ণিঝড়প্রবণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আরব সাগরেও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। আগে যেখানে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের অনুপাত ৪:১ ছিল, সাম্প্রতিক দশকে সেই ব্যবধান কমতে শুরু করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের মূল কেন্দ্র হিসেবে বঙ্গোপসাগরই পরিচিত।













