সুড়ঙ্গ রহস্য: কিংবদন্তি বনাম বাস্তবতা
কলকাতার ইতিহাসপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মুখে মুখে ফেরে এক রোমাঞ্চকর গল্প— শহরের বড় বড় ব্রিটিশ স্থাপত্য, যেমন রাইটার্স বিল্ডিং, ফোর্ট উইলিয়াম বা হেস্টিংস হাউস, সবই নাকি পরস্পরের সঙ্গে গোপন সুড়ঙ্গ
দিয়ে যুক্ত। বলা হয়, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ官দের পালানোর জন্য বা বিপ্লবীদের নজর এড়িয়ে সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র স্থানান্তরের জন্যই এই সুড়ঙ্গগুলি তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষ করে, রাইটার্স বিল্ডিং থেকে গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত একটি গোপন পথের কথা প্রায়শই শোনা যায়। এই গল্পগুলি কলকাতার সংস্কৃতি আর পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত বিচার করলে এক অন্য চিত্র ফুটে ওঠে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য কারণ
ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় ভূগর্ভস্থ পথ তৈরির কিছু কারণ অবশ্যই ছিল। ইংরেজ শাসকরা একদিকে যেমন ভারতীয় বিপ্লবীদের ভয় পেত, তেমনই সিরাজ-উদ-দৌলার কলকাতা আক্রমণের স্মৃতিও তাদের মনে তাজা ছিল। তাই গোপন পালানোর পথ বা সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল তৈরির ভাবনা একেবারে অমূলক নয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই কথিত সুড়ঙ্গগুলির বেশিরভাগই আসলে ব্রিটিশদের তৈরি করা উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা বড় ড্রেনেজ সিস্টেম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া সেই বিশাল নিকাশি পথগুলিকেই সাধারণ মানুষ সুড়ঙ্গ বলে ভুল করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, রেড রোডের নিচে একটি বিশাল ইটের তৈরি কালভার্ট পাওয়া গিয়েছিল, যা আসলে ময়দানের জল নিষ্কাশনের জন্য তৈরি হয়েছিল।
আবিষ্কার এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিভিন্ন সময়ে কলকাতার নানা প্রান্তে খোঁড়াখুঁড়ির সময় সুড়ঙ্গের মতো কাঠামোর সন্ধান মিলেছে। যেমন, ন্যাশনাল লাইব্রেরির নিচে একটি রহস্যময় ঘরের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল, যার কোনো দরজা বা জানালা ছিল না। আবার, জেনারেল পোস্ট অফিসের (GPO) সংস্কারকার্যের সময়ও একটি প্রাচীন কাঠামোর মুখ খুলে যায়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিকদের মতে, এগুলি কোনো দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার প্রমাণ মেলেনি। অনেক ক্ষেত্রে এগুলি ছিল কোনো পুরনো বাড়ির ভূগর্ভস্থ সেল, ওয়াইন সেলার বা বিচ্ছিন্ন কোনো কাঠামো। ঐতিহাসিকদের বড় অংশই মনে করেন, পুরো কলকাতাজুড়ে आपस में যুক্ত এক বিশাল সুড়ঙ্গ ব্যবস্থার ধারণাটি মূলত কল্পনাপ্রসূত, যার কোনো শক্তপোক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
রাইটার্স বিল্ডিং এবং ফোর্ট উইলিয়ামের কিংবদন্তি
সুড়ঙ্গ রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডালহৌসি স্কোয়ার, যা বর্তমানে বি.বা.দী. বাগ নামে পরিচিত। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য রাইটার্স বিল্ডিং। জনশ্রুতি আছে, এখান থেকে নাকি হুগলি নদী পর্যন্ত একটি গোপন পথ ছিল, যা দিয়ে ব্রিটিশ গভর্নররা বিপদের সময় জাহাজে করে পালাতেন। একইভাবে, ফোর্ট উইলিয়ামকে কেন্দ্র করেও একাধিক সুড়ঙ্গের গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার গোপন রাস্তা ছিল। তবে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সুড়ঙ্গ তৈরির সময় এই সব অঞ্চলের নিচ দিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করা হলেও, ব্রিটিশ আমলের কোনো গোপন সুড়ঙ্গের সন্ধান মেলেনি। মেট্রোর কাজের জন্য এই ঐতিহাসিক ভবনগুলিকে রক্ষা করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো অজানা সুড়ঙ্গের অস্তিত্ব সামনে আসেনি।
হেস্টিংস হাউস ও অন্যান্য জায়গার গল্প
শুধুমাত্র ডালহৌসি চত্বরই নয়, আলিপুরের হেস্টিংস হাউসকে ঘিরেও রয়েছে নানা রহস্যময় গল্প। ওয়ারেন হেস্টিংসের এই পুরনো বাসভবনটিকে নিয়ে নানা ভৌতিক কাহিনী প্রচলিত থাকলেও, এখান থেকে কোনো গোপন সুড়ঙ্গের অস্তিত্বের ठोस প্রমাণ মেলেনি। তবে হাওড়ার ডোমজুড়ে একটি রাজবাড়ির নিচে পুরনো একটি সুড়ঙ্গের মতো কাঠামো পাওয়া গিয়েছিল, যা বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর পালানোর গল্পের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয়। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হয়তো ছিল, কিন্তু তা থেকে সমগ্র কলকাতায় একটি সুসংহত সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা থাকার তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।











