মারাকানাজো: যে ট্র্যাজেডি ব্রাজিল ভুলতে পারে না (১৯৫০)
ফুটবল ইতিহাসে 'মারাকানাজো' বা 'মারাকানার ঘা' নামে পরিচিত এই ম্যাচটিকে কেবল একটি অঘটন বললে কম বলা হবে। এটি ছিল ব্রাজিলের জাতীয় ট্র্যাজেডি। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপটি ভিন্ন ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে
কোনো আনুষ্ঠানিক ফাইনাল ছিল না। চারটি দল ফাইনাল গ্রুপে রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে খেলেছিল। শেষ ম্যাচটিই কার্যত ফাইনালে পরিণত হয়, যেখানে স্বাগতিক ব্রাজিলের শিরোপা জিততে উরুগুয়ের বিপক্ষে শুধু একটি ড্র দরকার ছিল। রিও ডি জেনেইরোর newly-erected মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লক্ষ দর্শক ব্রাজিলের নিশ্চিত জয় দেখার জন্য জড়ো হয়েছিল। ম্যাচের আগে থেকেই ব্রাজিলের জয় উদযাপন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ফ্রেয়াশের গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলে সেই উদযাপন আরও বেড়ে যায়। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে সবাইকে অবাক করে দেয়। হুয়ান শিয়াফিনো প্রথমে সমতা ফেরান এবং খেলা শেষ হওয়ার মাত্র ১১ মিনিট আগে আলসিদেস ঘিঘিয়ার গোলে উরুগুয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ও বিশ্বকাপ জিতে নেয়। কানায় কানায় পূর্ণ মারাকানা স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে যায়, এবং এই হার ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত রেখে যায়।
দ্য মিরাকল অফ বার্ন: যখন জার্মানি ইতিহাস গড়ে (১৯৫৪)
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালটি 'দ্য মিরাকল অফ বার্ন' বা 'বার্নের অলৌকিক ঘটনা' নামে পরিচিত। এই ম্যাচে হাঙ্গেরির 'গোল্ডেন টিম' বা 'ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স'-এর মুখোমুখি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানি। ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে হাঙ্গেরি দলটি ছিল প্রায় অজেয়; তারা টানা চার বছরে ৩১টি ম্যাচে অপরাজিত ছিল এবং টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছিল। ফাইনালের দিন ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল, যা জার্মানদের কাছে 'ফ্রিৎস ভাল্টার ওয়েদার' নামে পরিচিত ছিল, কারণ তাদের অধিনায়ক ফ্রিৎস ভাল্টার বৃষ্টির মধ্যে খেলতে পারদর্শী ছিলেন। ম্যাচের শুরুতেই হাঙ্গেরি মাত্র ৮ মিনিটের মধ্যে ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, আরেকটি বড় ব্যবধানের হার সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু জার্মানরা হাল ছাড়েনি। তারা অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং ১৮ মিনিটের মধ্যেই ২-২ গোলে সমতা ফেরায়। খেলা শেষ হওয়ার ৬ মিনিট আগে হেলমুট রান তার বিখ্যাত গোলে জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এবং প্রথমবার বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন। এই জয়টি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না, এটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশের আত্মবিশ্বাস এবং সম্মান পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে ওঠে।
জিদানের জাদুতে রোনালদোর ব্রাজিলের পতন (১৯৯৮)
১৯৯৮ সালের ফাইনালটি আগের দুটির মতো ঐতিহাসিক অঘটন না হলেও, এটি ছিল আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় বিস্ময়। ব্রাজিল ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং তাদের দলে ছিলেন গ্রহের সেরা খেলোয়াড় রোনালদো। টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত খেলা ব্রাজিলকে অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছিল। অন্যদিকে, স্বাগতিক ফ্রান্স প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠেছিল এবং তাদের ওপর তেমন কোনো প্রত্যাশার চাপ ছিল না। ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা তৈরি হয় রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতা নিয়ে। ফাইনালের কয়েক ঘন্টা আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, যা নিয়ে আজও অনেক জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। যদিও শেষ মুহূর্তে তাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কিন্তু মাঠে তিনি ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগায় ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে ফরাসিরা নিজেদের সেরা খেলাটা খেলে। জিদানের দুটি হেডার গোল এবং এমানুয়েল পেটিতের শেষ মুহূর্তের গোলে ফ্রান্স ৩-০ ব্যবধানে ব্রাজিলকে উড়িয়ে দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয়। ফেভারিট ব্রাজিলের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল।










