ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা ঠিক কী?
আমাদের শরীর তার স্বাভাবিক কাজকর্ম, যেমন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল রাখা এবং বর্জ্য পদার্থ দূর করার জন্য জলের উপর নির্ভরশীল। যখন শরীর থেকে গ্রহণ করার চেয়ে বেশি পরিমাণে জল ও খনিজ লবণ (ইলেক্ট্রোলাইট)
বেরিয়ে যায়, তখন সেই অবস্থাকে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা বলা হয়। গরমকালে অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া, বমি বা পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান না করার কারণে এটি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণ না করা হলে শারীরিক কার্যকারিতা ব্যাহত হতে শুরু করে।
সাধারণ জলশূন্যতার লক্ষণ ও ঘরোয়া সমাধান
ডিহাইড্রেশন শুরু হলে শরীর কিছু প্রাথমিক সঙ্কেত দেয়। যেমন, খুব তৃষ্ণা পাওয়া, মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্তি বোধ করা, মাথা ধরা এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা তার রঙ গাঢ় হলুদ হয়ে যাওয়া। এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে বুঝতে হবে শরীরে জলের ঘাটতি শুরু হয়েছে। এই প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ জলই যথেষ্ট। এর পাশাপাশি, ঘরে তৈরি পানীয় যেমন নুন-চিনির শরবত, লেবুর জল, ডাবের জল, ঘোল বা ফলের রস পান করলে উপকার পাওয়া যায়। এই পানীয়গুলি শুধু জলের ঘাটতিই পূরণ করে না, শরীরের প্রয়োজনীয় কিছু খনিজ পদার্থও ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। যারা মূলত বাড়ির ভেতরে বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকেন এবং খুব বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেন না, তাদের জন্য এই সমাধানই সাধারণত যথেষ্ট।
কখন ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ORS) প্রয়োজন?
যখন জলশূন্যতার মাত্রা মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সাধারণ পানীয় যথেষ্ট নাও হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ORS প্রয়োজন। ORS শুধু জল নয়, এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দ্বারা অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা, যেখানে গ্লুকোজ, সোডিয়াম এবং পটাশিয়ামের মতো ইলেক্ট্রোলাইট সঠিক অনুপাতে মেশানো থাকে। এই মিশ্রণটি শরীরকে খুব দ্রুত জল ও খনিজ শোষণ করতে সাহায্য করে, যা সাধারণ পানীয় পারে না। কিছু গুরুতর লক্ষণ দেখলে ORS খাওয়া আবশ্যক: - খুব বেশি দুর্বল লাগা, মাথা ঝিমঝিম করা বা মাথা ঘোরা। - হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া। - চোখ কোটরের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। - কান্না করলেও চোখ দিয়ে জল না পড়া (বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে)। - ৮-১০ ঘণ্টা ধরেও প্রস্রাব না হওয়া। - প্রচণ্ড ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জল বেরিয়ে গেলে। এই লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়, কারণ এগুলি মাঝারি থেকে গুরুতর ডিহাইড্রেশনের ইঙ্গিত দেয়।
ORS ব্যবহারের সঠিক নিয়ম কী?
ORS-এর সম্পূর্ণ উপকার পেতে এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা জরুরি। প্যাকেটের গায়ে লেখা নির্দেশাবলী সাবধানে পড়ুন। সাধারণত এক প্যাকেট ORS এক লিটার পরিষ্কার পানীয় জলে মেশাতে হয়। জল ফুটিয়ে ঠান্ডা করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। এই মিশ্রণে অতিরিক্ত চিনি, নুন বা অন্য কিছু মেশাবেন না। ORS মেশানো জল একবারে অনেকটা না খেয়ে, সারাদিন ধরে অল্প অল্প করে পান করুন। তৈরি করা দ্রবণটি ২৪ ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। বাজারে উপলব্ধ বিভিন্ন ফ্লেভারযুক্ত এনার্জি ড্রিঙ্ককে ORS ভেবে ভুল করবেন না; কেনার আগে প্যাকেটে WHO-অনুমোদিত ফর্মুলা লেখা আছে কি না, তা দেখে নিন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
ORS ডিহাইড্রেশনের প্রথম সারির চিকিৎসা হলেও এটি সব সমস্যার সমাধান নয়। যদি ORS খাওয়ার পরেও অবস্থার উন্নতি না হয় বা লক্ষণগুলি আরও খারাপ হতে থাকে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষত, যদি রোগীর চেতনা কমে আসে, সে কিছুই খেতে বা পান করতে না পারে, অথবা তার খিঁচুনি শুরু হয়, তবে এটি একটি আপৎকালীন পরিস্থিতি এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস বা কিডনির মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তাদের বিষয়ে শুরু থেকেই অতিরিক্ত সতর্ক থাকা উচিত।














