বার্লিনের সেই রুদ্ধশ্বাস কোয়ার্টার ফাইনাল
৩০ জুন, ২০০৬। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি জার্মানি ও আর্জেন্টিনা। তখন লিওনেল মেসি কেবল এক বিস্ময় বালক। ১৮ বছর বয়সে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর
বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পরিবর্ত হিসেবে নেমে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালের মতো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে কোচ হোসে পেকারম্যান তাঁকে প্রথম একাদশে রাখেননি। ম্যাচের ৪৯ মিনিটে রবার্তো আয়ালার গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। জয়ের স্বপ্ন যখন দানা বাঁধছে, ঠিক তখনই ৮০ মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোসার গোলে সমতা ফেরায় জার্মানি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, কিন্তু গোলের দেখা মেলে না। খেলা চলে যায় টাইব্রেকারে, যেখানে স্নায়ুর চাপ সামলাতে না পেরে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
পেকারম্যানের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে, তখনও আর্জেন্টিনার বেঞ্চে বসে আছেন মেসি। দলের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়দের একজন, যিনি একাই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু কোচ পেকারম্যান তাঁকে নামানোর কথা ভাবেননি। তিনি তাঁর তিনটি পরিবর্তই ব্যবহার করে ফেলেন। প্রথমে নামান এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসোকে, তারপর গোলরক্ষক রবার্তো আবোনদানজিয়েরি চোট পাওয়ায় নামাতে বাধ্য হন লিও ফ্রাঙ্কোকে। শেষ পরিবর্ত হিসেবে পেকারম্যান মাঠে নামান স্ট্রাইকার হুলিও ক্রুজকে। এই সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। কেন একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা লম্বা স্ট্রাইকারের উপর ভরসা রাখলেন কোচ, যখন তাঁর হাতে মেসির মতো একজন গেম চেঞ্জার ছিল? এই প্রশ্ন আজও অনেক ফুটবলপ্রেমীকে তাড়া করে বেড়ায়। পেকারম্যান পরে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তিনি উচ্চতার সুবিধা নিতে ক্রুজকে নামিয়েছিলেন সেট-পিস রক্ষার জন্য। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করে দেয়।
ডাগআউটে কান্না ও ড্রেসিংরুমে ক্ষোভ
টাইব্রেকারে যখন সতীর্থরা একে একে পেনাল্টি মিস করছেন, তখন ডাগআউটে বসে থাকা মেসির মুখ ছিল যন্ত্রণায় ভরা। তাঁর চোখে জল। দলের জন্য কিছু করতে না পারার অসহায়ত্ব তাঁকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। ম্যাচ শেষে সতীর্থরা যখন মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, মেসি তখন রাগে, দুঃখে প্রায় দিশেহারা। সতীর্থ লিয়ান্দ্রো কুফ্রে পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে মেসিকে সামলানো যাচ্ছিল না। তিনি পাগলের মতো কাঁদছিলেন এবং দেওয়ালে ঘুষি মারছিলেন। তাঁর ক্ষোভ ছিল মূলত নিজের উপর এবং সেই পরিস্থিতির উপর, যা তাঁকে দলের সাহায্যে এগিয়ে আসতে দেয়নি। কুফ্রের কথায়, "সেদিন আমি প্রথমবার মেসির এমন রূপ দেখেছিলাম। ওঁর যন্ত্রণা দেখে আমাদের নিজেদের হারার দুঃখও কমে গিয়েছিল।" ১৮ বছরের এক তরুণের কাছে বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে এভাবে বিদায় নেওয়া ছিল এক বিরাট মানসিক আঘাত।
যে যন্ত্রণা জন্ম দিয়েছিল নতুন ইতিহাসের
২০০৬ সালের সেই রাত মেসির জীবনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। কিন্তু এই যন্ত্রণা, এই অপমানই হয়তো তাঁর ভেতরের আগুনকে আরও উস্কে দিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, নিজের ভাগ্য নিজের হাতেই লিখতে হবে। এরপরের প্রতিটি বিশ্বকাপে তিনি এসেছেন আরও পরিণত হয়ে, আরও ক্ষুধার্ত হয়ে। ২০১০, ২০১৪, ২০১৮—বারবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছেই হার ছিল আরেকটি বড় আঘাত। কিন্তু ২০০৬ সালের সেই স্মৃতি তাঁকে কখনও থামতে দেয়নি। বরং সেই দিনের অসহায়ত্ব তাঁকে শিখিয়েছিল, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে হয়। ১৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২২ সালে এসে যখন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুললেন, তখন তাঁর চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। সেই অশ্রুর পিছনে লুকিয়ে ছিল ২০০৬ সালের বার্লিনের সেই রাতের যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর প্রতিজ্ঞা। সেদিন মাঠে নামতে না পারার আক্ষেপই হয়তো তাঁকে বিশ্বসেরা হওয়ার পথে এগিয়ে দিয়েছিল কয়েক ধাপ।













