পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা কোনটি?
আমরা অনেকেই মনে করি আন্দিজ পর্বতমালা পৃথিবীর দীর্ঘতম, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার। কিন্তু এই তথ্যটি কেবল ভূপৃষ্ঠের জন্য সত্য। আসল সত্যি হলো, পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতশ্রেণীটি সমুদ্রের নিচে অবস্থিত, যার নাম
মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা বা মিড-ওশানিক রিজ (Mid-Oceanic Ridge)। এই বিশাল পর্বত ব্যবস্থাটি প্রায় ৬৫,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা পৃথিবীকে একটি বেসবলের সেলাইয়ের মতো ঘিরে রেখেছে। এটি আটলান্টিক, প্রশান্ত, ভারত মহাসাগরসহ বিশ্বের প্রতিটি মহাসাগরের তলদেশে বিস্তৃত। এই পর্বতমালা এতটাই বিশাল যে এর সামনে আন্দিজ পর্বতমালাকেও ছোট মনে হয়।
কীভাবে তৈরি হলো এই জলমগ্ন পর্বত?
এই সামুদ্রিক পর্বতমালা তৈরির প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপের এক অসাধারণ উদাহরণ। এটি টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর ভূত্বক কয়েকটি বিশাল প্লেটে বিভক্ত, যা প্রতিনিয়ত নড়াচড়া করছে। যখন দুটি প্লেট একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, তখন ভূ-অভ্যন্তরের গরম ও গলিত পাথর বা ম্যাগমা বেরিয়ে এসে সেই ফাঁক পূরণ করে। এই গরম লাভা সমুদ্রের ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এসে জমে গিয়ে নতুন ভূত্বক এবং পর্বতের মতো কাঠামো তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে 'সমুদ্রতল প্রসারণ' বা 'সি-ফ্লোর স্প্রেডিং' বলা হয়। বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকায় বিশাল এক পর্বতমালার শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে, যা আজও সক্রিয় এবং ক্রমাগত নতুন ভূত্বক তৈরি করে চলেছে।
শুধু পর্বত নয়, এক বিস্ময়কর জগৎ
মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা কেবল পাথরের স্তূপ নয়, এটি এক বিচিত্র এবং রহস্যময় জগতের ঠিকানা। এখানে রয়েছে হাজার হাজার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। এই পর্বতশ্রেণীর কিছু কিছু জায়গায় ফাটল দিয়ে গরম পানি বেরিয়ে আসে, যাকে 'হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট' বলা হয়। এই চরম উষ্ণ এবং রাসায়নিক পদার্থে পূর্ণ পরিবেশেও গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত ইকোসিস্টেম। এখানে এমন সব অণুজীব ও প্রাণী বাস করে, যারা বেঁচে থাকার জন্য সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে। এছাড়াও, এই শৈলশিরার আশেপাশে অসংখ্য একক আগ্নেয়গিরি পর্বত রয়েছে, যেগুলোকে 'সিমাউন্ট' বলা হয়। বিশ্বজুড়ে এমন প্রায় এক লক্ষেরও বেশি সিমাউন্ট রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। এই সিমাউন্টগুলো গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এই পর্বতমালা এত গুরুত্বপূর্ণ?
সমুদ্রের নিচের এই পর্বতমালা পৃথিবীর জন্য একাধিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এখানেই পৃথিবীর নতুন ভূত্বক তৈরি হয়, যা আমাদের গ্রহকে ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় রাখে। দ্বিতীয়ত, এই পর্বতমালার কারণে সমুদ্রের স্রোত প্রভাবিত হয়, যা বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার বিন্যাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, হাইড্রোথার্মাল ভেন্টগুলো সমুদ্রের পানিতে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মেশায়, যা সামুদ্রিক রসায়নকে প্রভাবিত করে। এবং চতুর্থত, এই সিমাউন্ট এবং শৈলশিরাগুলো বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং খাদ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে, যা এদেরকে জীববৈচিত্র্যের 'হটস্পট' বা মরূদ্যান করে তুলেছে। অনেক বিরল প্রজাতির হাঙর, মাছ এবং প্রবাল এখানে পাওয়া যায়।

















