কেন ভারতের প্রতি এই আগ্রহ?
বিশ্বব্যাপী যখন অনেক বড় অর্থনীতি হোঁচট খাচ্ছে, তখন ভারত স্থিতিশীল বৃদ্ধি দেখিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, 'মেক ইন ইন্ডিয়া' এবং প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) -এর মতো সরকারি প্রকল্পগুলি ভারতকে একটি বিশ্বমানের
উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলির অধীনে, সরকার উৎপাদন এবং বিক্রয়ের উপর ভিত্তি করে সংস্থাগুলিকে আর্থিক উৎসাহ প্রদান করে, যা বিদেশি সংস্থাগুলিকে ভারতে তাদের কারখানা স্থাপন করতে উৎসাহিত করছে। এছাড়াও, 'চায়না প্লাস ওয়ান' কৌশলের অংশ হিসেবে অনেক বহুজাতিক সংস্থা তাদের উৎপাদনের জন্য চীনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এর ফলে, এপ্রিল ২০২৬-এর মতো একটি মাসেই ভারতে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) ১৫.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক শক্তির পরিচয় দেয়।
উৎপাদন ও ইলেকট্রনিক্স: এক নতুন দিগন্ত
একটা সময় ছিল যখন ভারতের বাজার বিদেশি ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ছেয়ে থাকত। কিন্তু পিএলআই প্রকল্পের হাত ধরে সেই ছবিটা দ্রুত বদলাচ্ছে। আজ ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন উৎপাদক দেশ। অ্যাপল এবং স্যামসাং-এর মতো বিশ্বসেরা সংস্থাগুলি এখন ভারতেই তাদের অত্যাধুনিক ফোন তৈরি করছে। শুধু মোবাইল ফোনই নয়, সেমিকন্ডাক্টর, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স উপাদান তৈরির জন্যেও ভারতকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ভারতকে একটি স্বনির্ভর ইলেকট্রনিক্স হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো। এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ বিশাল কারণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা বিপুল এবং রপ্তানির সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।
নবায়নযোগ্য শক্তি: ভবিষ্যতের জ্বালানি
পরিবেশ সচেতনতা এবং শক্তি সুরক্ষার তাগিদে ভারত নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ৫০% অ-জীবাশ্ম জ্বালানি উৎস থেকে উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি প্রধান। এই বিপুল লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আগামী কয়েক বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। সরকার গ্রিন হাইড্রোজেন এবং ব্যাটারি স্টোরেজের মতো নতুন প্রযুক্তিকেও উৎসাহ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের এই সবুজ বিপ্লবে অংশ নিতে অত্যন্ত আগ্রহী, কারণ এটি শুধুমাত্র লাভজনকই নয়, পরিবেশগতভাবেও দায়িত্বশীল একটি বিনিয়োগের ক্ষেত্র।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও ফিনটেক: প্রযুক্তির বিস্ফোরণ
ভারতের প্রায় ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এই বিশাল ব্যবহারকারীর ভিত্তি ডিজিটাল পরিষেবা, ই-কমার্স এবং ফিনটেকের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) ডিজিটাল লেনদেনে বিপ্লব এনেছে এবং ভারত আজ ফিনটেক গ্রহণের হারে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। ডিজিটাল ঋণ, বীমা প্রযুক্তি (ইনসিওরটেক), এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা (ওয়েলথটেক) দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বেঙ্গালুরু, মুম্বাই এবং গুরুগ্রামের মতো শহরগুলি ফিনটেক স্টার্টআপের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ক্রমাগত বাড়ছে।
পরিকাঠামো এবং ওষুধ শিল্প: দেশের ভিত্তি
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হল তার পরিকাঠামো। ভারত সরকার জাতীয় পরিকাঠামো পাইপলাইনের অধীনে রাস্তা, রেল, বন্দর এবং বিমানবন্দর নির্মাণে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সরকারি অর্থের পাশাপাশি বেসরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে, কোভিড অতিমারীর পর থেকে ভারত 'বিশ্বের ঔষধালয়' হিসেবে নিজের স্থান আরও মজবুত করেছে। ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে গবেষণা, উন্নয়ন এবং অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API) তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য সরকার পিএলআই প্রকল্প চালু করেছে। এই দুটি ক্ষেত্রই দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।














