বয়স যখন সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ
যেকোনো আলোচনার শুরুতেই যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো বয়স। ২০৩০ সালে যখন স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর সঙ্গে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়েতে বিশ্বকাপের শতবর্ষীয় আসর বসবে, তখন লিওনেল মেসির বয়স হবে ৪৩ বছর।
ফুটবল, বিশেষ করে আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের জন্য এই বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা প্রায় অসম্ভব। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন মিশরের গোলরক্ষক এসাম এল-হাদারি, যিনি ২০১৮ সালে ৪৫ বছর বয়সে খেলেছিলেন। তবে গোলরক্ষক ও আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের শারীরিক চাহিদা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও রজার মিল্লার মতো ক্যামেরুনের কিংবদন্তি ৪২ বছর বয়সে গোল করে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন, তবে আধুনিক ফুটবলের গতি এবং তীব্রতা অনেক বেড়েছে। তাই মেসির জন্য ৪৩ বছর বয়সে পুরো টুর্নামেন্টে খেলাটা হবে সবচেয়ে বড় শারীরিক চ্যালেঞ্জ।
মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণার উৎস
শারীরিক বাধার পাশাপাশি, প্রশ্ন ওঠে মানসিকতারও। যে খেলোয়াড় ফুটবলীয় অর্জনের শীর্ষে পৌঁছেছেন, সম্ভাব্য সবকিছু জিতেছেন, তার জন্য নতুন করে অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই তার ক্যারিয়ারের শেষ। কিন্তু তিনি খেলা চালিয়ে গেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি দলকে ফাইনালে নিয়ে গেছেন। এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে মেসি জানিয়েছেন, তিনি যতদিন খেলাটা উপভোগ করবেন এবং শারীরিকভাবে সতীর্থদের সাহায্য করতে পারবেন, ততদিন খেলে যাবেন। তিনি ২০৩০ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেছেন, বিষয়টি এখনও অনেক দূরের। তবে ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা এবং দেশের জার্সিতে খেলার আনন্দই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। বিশেষ করে, টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচ যখন তার নিজের দেশ আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত হবে, সেই আকর্ষণ উপেক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
বদলে যাওয়া খেলার ধরণ
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেসি তার খেলার ধরণ বদলেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে যে explosiveness বা গতি দেখা যেত, এখন তার জায়গা নিয়েছে অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। তিনি এখন পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ানোর পরিবর্তে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় উপস্থিত থেকে খেলার চিত্র বদলে দেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ন্যূনতম শারীরিক পরিশ্রমে সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলা যায়। যদি তিনি ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলার কথা ভাবেন, তবে তাকে হয়তো আরও বেশি প্লেমেকার বা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় দেখা যাবে, যিনি বেঞ্চ থেকে এসে শেষ ২০-৩০ মিনিটে নিজের অভিজ্ঞতার জাদু দেখাতে পারেন। আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চললে, এই ভূমিকা পালন করা তার জন্য অসম্ভব নাও হতে পারে।
কোচ ও দলের পরিকল্পনা
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেসির হলেও, দলের কোচ এবং সতীর্থদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কোচ লিওনেল স্কালোনি বারবার বলেছেন যে, মেসির জন্য জাতীয় দলের দরজা সবসময় খোলা। তার মতে, মেসি যতদিন চাইবেন, ততদিন খেলবেন এবং এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র তারই। স্কালোনি মেসিকে 'ইতিহাসের সেরা' বলে অভিহিত করে জানিয়েছেন, ৩৯ বছর বয়সে ফাইনালে খেলাটাই অবিশ্বাস্য। তবে একই সঙ্গে, আর্জেন্টিনাকে ভবিষ্যতের জন্যও দল গোছাতে হবে। আনহেল দি মারিয়ার মতো খেলোয়াড়রা ইতিমধ্যেই অবসরের পথে, এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা উঠে আসছেন। দলে একজন ৪৩ বছর বয়সী আইকনিক খেলোয়াড়ের উপস্থিতি তরুণদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, নাকি দলের গঠনে কোনো কৌশলগত সমস্যা তৈরি করবে, সেই সিদ্ধান্তও টিম ম্যানেজমেন্টকে নিতে হবে।









