স্বপ্নের রাত, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস
গঞ্জালো মন্তিয়েলের পেনাল্টি শটটা জালে জড়াতেই যেন একটা টাইম বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে বুয়েনস আইরেস, কলকাতা থেকে ঢাকা—বিশ্বের প্রতিটি কোণায় আর্জেন্টাইন সমর্থকরা তখন উল্লাসে ফেটে
পড়ছে। মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন লিওনেল মেসি। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরেছেন। কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এই মুহূর্তটার জন্যই তো তাঁর আজীবনের অপেক্ষা। এই একটা ট্রফিই তাঁর বর্ণময় কেরিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা ছিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, দর্শকদের গর্জন আর সতীর্থদের ভালোবাসার মধ্যে ডুবে থাকা মেসি তখন যেন এক ঘোরের মধ্যে। এই রাতটা তাঁর, একান্তই তাঁর। যে রাতে তিনি ফুটবল বিশ্বকে সম্পূর্ণ করেছেন।
হট্টগোলের মাঝে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা
মাঠের আনুষ্ঠানিকতা, ছবি তোলা আর সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনের পর মেসি যখন ড্রেসিংরুমে ফেরেন, তখনও উৎসবের আবহ কমেনি। চারদিকে গান, নাচ আর চিৎকারের মাঝেও একটা ব্যক্তিগত মুহূর্তের প্রয়োজন হয়। প্রত্যেকেরই ইচ্ছে করে এই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দটা ভাগ করে নিতে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর সঙ্গে। অবশেষে হাতে আসে ফোন। ততক্ষণে হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, মেসেজের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে তাঁর ইনবক্স। বিশ্বের তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্ব, কিংবদন্তি খেলোয়াড়, বন্ধু-বান্ধব—শুভেচ্ছার স্রোত বইছে। কিন্তু এই হাজারো বার্তার ভিড়ে মেসির চোখ খুঁজছিল কয়েকটি বিশেষ নাম। তাঁর পরিবার। তাঁর শক্তির উৎস।
প্রথম বার্তা, চিরকালের সঙ্গীর থেকে
বিশ্বকাপ জয়ের কিছুদিন পর এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই এই রহস্যের সমাধান করেন। আর্জেন্টাইন সঞ্চালক অ্যান্ডি কুসনেটজফকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে মেসি জানান, সেই রাতে তিনি প্রথম যে বার্তাটি দেখেছিলেন, সেটি ছিল তাঁর স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোর। মেসি বলেন, "ড্রেসিংরুমে ফিরে ফোনটা হাতে নিই। প্রথম মেসেজটা ছিল আন্তোনেলার।" তিনি আরও যোগ করেন যে, শুধু আন্তোনেলাই নন, তাঁর সন্তানেরাও জেগে ছিল এবং পুরো ফাইনাল ম্যাচটি উত্তেজনা আর আবেগ দিয়ে উপভোগ করেছে। আন্তোনেলার বার্তাটি ঠিক কী ছিল, তা মেসি জনসমক্ষে আনেননি। কিন্তু তার প্রয়োজনও নেই। যে মানুষটি তাঁর শৈশবের বন্ধু, কৈশোরের প্রেম এবং জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন, তাঁর পাঠানো বার্তাটিই যে প্রথম হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। এই বার্তা শুধু একটা শুভেচ্ছা ছিল না, ছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে পাওয়া শান্তির প্রথম পরশ।
শুধু স্ত্রী নন, পথের সবচেয়ে বড় শক্তি
লিওনেল মেসি এবং আন্তোনেলা রোকুজ্জোর সম্পর্কটা কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম নয়। রোজারিওর রাস্তায় একসঙ্গে বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে বার্সেলোনার দিনগুলো এবং অবশেষে প্যারিস—আন্তোনেলা সবসময়ই মেসির পাশে থেকেছেন ছায়ার মতো। শুধু ভালো সময়ে নয়, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও তিনিই ছিলেন মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর মেসি যখন অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, তখন আন্তোনেলাই তাঁকে মানসিক জোর জোগান। মেসির কেরিয়ারের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর পরিবারের, বিশেষ করে আন্তোনেলার, এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে। আন্তোনেলা কোনো জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রার পরিবর্তে বরাবরই একজন ব্যক্তিগত মানুষ হিসেবে থেকেছেন। তিনি মেসির স্টারডমকে নয়, মানুষ মেসিকে ভালোবেসেছেন। তাই বিশ্বকাপের মতো জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জয়ের পর তাঁর বার্তাটিই ছিল মেসির জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত।
পরিবারই মেসির ‘আসল বিশ্বকাপ’
বিশ্বকাপ জয়ের পর মাঠে মেসির মা সেলিয়া মারিয়া কুকসিটিনির ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটি আজও ভক্তদের চোখে ভাসে। তাঁর তিন সন্তান—থিয়াগো, মাতেও এবং সিরো—বাবার এই ঐতিহাসিক জয়ে যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল, তা বুঝিয়ে দেয় মেসির জীবনে পরিবারের গুরুত্ব কতটা। থিয়াগো তো ম্যাচের পর বাবাকে লেখা একটি আবেগঘন চিঠিতে জাতীয় সঙ্গীতের লাইন উদ্ধৃত করে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। মেসি বারবার বলেছেন, তাঁর কাছে তাঁর পরিবারই সবকিছু। ফুটবল, খ্যাতি, অর্থ—এসবের ঊর্ধ্বে তাঁর সন্তানের হাসি আর আন্তোনেলার ভালোবাসা। তাই বিশ্বজয়ের রাতে প্রথম বার্তাটি যখন আন্তোনেলার কাছ থেকে আসে, তখন এটা শুধু একটা ঘটনা থাকে না, হয়ে ওঠে একটা প্রতীক। এটা প্রমাণ করে যে, বিশ্বসেরা ফুটবলারের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর পরিবার। তাঁর আসল বিশ্বকাপ তো তারাই।















