আধুনিক জীবনযাত্রা এবং অপর্যাপ্ত সূর্যালোক
ভিটামিন ডি 'সানশাইন ভিটামিন' নামেই পরিচিত, কারণ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (UVB) ত্বকে পড়লে আমাদের শরীর এটি তৈরি করে। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে আমরা সূর্যের আলো থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। বেশিরভাগ
মানুষ এখন অফিস বা বাড়ির ভেতরেই দিনের বড় অংশ কাটান। সকালে বাড়ি থেকে গাড়িতে বা বাসে অফিসে যাওয়া এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসার চক্রে সরাসরি সূর্যের আলো শরীরে লাগার সুযোগই হয় না। এমনকি কাঁচের জানালার মধ্যে দিয়ে যে আলো আসে, তা ভিটামিন ডি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় UVB রশ্মিকে আটকে দেয়। এর ফলে, পর্যাপ্ত রোদ থাকা সত্ত্বেও আমাদের শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে না।
ত্বকের রঙ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য
ভারতীয়দের ত্বকের রঙ তুলনামূলকভাবে গাঢ়। ত্বকে মেলানিন নামক এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ থাকে যা সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে। তবে এই মেলানিন ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়াকেও ধীর করে দেয়। এর অর্থ হলো, ফর্সা ত্বকের অধিকারী মানুষদের তুলনায়, গাঢ় ত্বকের ভারতীয়দের একই পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরি করতে বেশি সময় ধরে রোদে থাকতে হয়। এই জিনগত কারণেই পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা সত্ত্বেও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি ভারতীয়দের মধ্যে বেশি থাকে।
খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টির অভাব
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকাতেও ভিটামিন ডি-এর অভাব রয়েছে। বেশিরভাগ ভারতীয়, বিশেষ করে নিরামিষাশীরা, এমন খাবার খান যেখানে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি কম থাকে। তৈলাক্ত মাছ (যেমন স্যামন, টুনা), ডিমের কুসুম এবং গরুর লিভারের মতো খাবারগুলিতে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, যা অনেকেরই খাদ্যতালিকায় নিয়মিত থাকে না। ভারতে দুধ বা অন্যান্য খাবারের প্যাকেটে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি যোগ করার (fortification) প্রবণতাও খুব কম। ফলে, শুধুমাত্র খাবারের মাধ্যমে ভিটামিন ডি-এর চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবেশ দূষণ এবং ভৌগোলিক অবস্থান
বড় শহরগুলিতে বায়ু দূষণ একটি বড় সমস্যা। বাতাসে ভাসমান দূষণ কণা, যেমন ধোঁয়া ও ধূলিকণা, সূর্যের UVB রশ্মিকে পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দেয়। এর ফলে, এমনকি যদি কেউ রোদে সময় কাটান, দূষণের কারণে তার ত্বক পর্যাপ্ত UVB রশ্মি পায় না এবং ভিটামিন ডি তৈরি ব্যাহত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির হার গ্রামের মানুষের চেয়ে বেশি। যদিও ভারত বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত, কিন্তু দূষণের এই স্তর ভিটামিন ডি সংশ্লেষণে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্য সমস্যা
অনেকেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির লক্ষণগুলি সম্পর্কে সচেতন নন। ক্লান্তি, পেশী ও হাড়ে ব্যথা, ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া বা চুল পড়ার মতো সমস্যাগুলিকে সাধারণ ভেবে এড়িয়ে যান। এছাড়া স্থূলতা, কিডনি বা লিভারের রোগ এবং হজমের সমস্যা থাকলেও শরীর ভিটামিন ডি শোষণ বা ব্যবহার করতে পারে না, যা ঘাটতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। এই বিষয়ে সচেতনতার অভাব থাকায় সঠিক সময়ে পরীক্ষা বা চিকিৎসা করানো হয় না, ফলে সমস্যাটি নীরবে বাড়তে থাকে।













