দিয়েগো মারাদোনা (১৯৮৬)
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপকে অনেকেই 'মারাদোনার বিশ্বকাপ' বলে থাকেন। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে তিনি নিজে গোল না করলেও, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন তারই জাদুকরী এক পাস থেকে। আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে
যাওয়ার পর জার্মানি দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফিরে এসে ২-২ সমতা করে। খেলা যখন শেষের দিকে, তখন সবাই অতিরিক্ত সময়ের কথাই ভাবছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে, ম্যাচের ৮৪ মিনিটে, মারাদোনা মাঝমাঠ থেকে একটি অবিশ্বাস্য পাস বাড়ান হোর্হে বুরুচাগার দিকে। জার্মান রক্ষণভাগকে চিরে দেওয়া সেই নিখুঁত পাস ধরেই বুরুচাগা গোল করে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দেন। পুরো টুর্নামেন্টে দলকে একা কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ফাইনালে এমন निर्णायक মুহূর্তে তার অবদান মারাদোনাকে ফুটবল ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
জিনেদিন জিদান (১৯৯৮)
ঘরের মাঠের ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল ও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। রোনাল্ডো, রিভাল্ডো, রবার্তো কার্লোসদের নিয়ে গড়া সেই দলকে হারানো প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু ফরাসি মিডফিল্ড জেনারেল জিনেদিন জিদান যেন পণ করেই নেমেছিলেন। প্রথমার্ধেই তিনি এমন কিছু করেন যা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকে। সাধারণত হেডে গোল করায় তেমন পারদর্শী না হলেও, জিদান দুটি কর্নার থেকে দুর্দান্ত দুটি হেডে ব্রাজিলের জালে বল জড়িয়ে দেন। ম্যাচের ২৭ মিনিটে এবং প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে তার করা দুটি গোলই ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয় এবং ব্রাজিলের মনোবল ভেঙে দেয়। তার এই জোড়া গোলের সুবাদেই ফ্রান্স ৩-০ গোলে ফাইনাল জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ঘরে তোলে।
রোনাল্ডো নাজারিও (২০০২)
১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে রহস্যময় অসুস্থতার কারণে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন রোনাল্ডো। চার বছর পর, ২০০২ সালের ফাইনালে তিনি সেই আক্ষেপ সুদে-আসলে মিটিয়ে নেন। জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে ব্রাজিল যখন গোলের জন্য লড়ছিল, তখন ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন 'ও ফেনোমেনো'। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে রিভাল্ডোর একটি শট জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান হাত থেকে ফেলে দিলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে প্রথম গোলটি করেন রোনাল্ডো। এর মাত্র ১২ মিনিট পর, ক্লেবারসনের পাস থেকে রিভাল্ডোর দুর্দান্ত এক ডামির পর বল পেয়ে যান তিনি এবং জার্মান ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন। তার জোড়া গোলেই ব্রাজিল ২-০ ব্যবধানে জার্মানিকে হারিয়ে রেকর্ড পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতে এবং রোনাল্ডো ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন।
আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (২০১০)
স্পেন এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যে ২০১০ সালের ফাইনালটি ছিল অত্যন্ত শারীরিক ও উত্তেজনাকর একটি ম্যাচ। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোল করতে পারেনি। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচের ভাগ্য পেনাল্টি শুট-আউটে নির্ধারিত হতে চলেছে, ঠিক তখনই স্পেনের 'সোনালী প্রজন্মের' অন্যতম সেরা তারকা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা নায়ক হয়ে ওঠেন। ম্যাচের ১১৬ মিনিটে সেস ফ্যাব্রেগাসের কাছ থেকে পাস পেয়ে বক্সের ভেতর থেকে জোরালো এক শটে বল জালে জড়ান তিনি। তার সেই ঐতিহাসিক গোলেই স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় এবং ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখে। সেই গোলটি বিশ্বকাপের ফাইনালের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে।
কিলিয়ান এমবাপে (২০২২)
দল হারলেও বিশ্বকাপের ফাইনালে একার লড়াই কেমন হতে পারে, তার সেরা উদাহরণ কিলিয়ান এমবাপে। ২০২২ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনা যখন ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে ৮১ মিনিট পর্যন্ত সহজ জয়ের স্বপ্ন দেখছিল, তখন এমবাপে মাত্র ৯৭ সেকেন্ডের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ফেরান। প্রথমে পেনাল্টি থেকে এবং পরে একটি দুর্দান্ত ভলিতে গোল করে তিনি খেলাকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান। অতিরিক্ত সময়ে মেসি আর্জেন্টিনাকে আবার এগিয়ে দিলেও, এমবাপে আবারও পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যান। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় খেলোয়াড় হয়েও দলকে জেতাতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও, তার এই লড়াকু মানসিকতা ও অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়।












