এখন আমরা সময় কীভাবে মাপি?
বর্তমানে সময়ের সংজ্ঞা নির্ভর করে পারমাণবিক ঘড়ির ওপর। ১৯৬৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি সিজিয়াম-১৩৩ পরমাণুর নির্দিষ্ট দুটি শক্তিস্তরের মধ্যে ইলেকট্রনের ৯,১৯২,৬৩১,৭৭০ বার কম্পন
করতে যে সময় লাগে, তাকেই এক সেকেন্ড বলা হয়। এই অ্যাটমিক ক্লক বা পারমাণবিক ঘড়িগুলো অবিশ্বাস্যভাবে সঠিক এবং স্থিতিশীল। পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতির ওপর নির্ভর করে আগে যেভাবে সময় মাপা হতো, তার চেয়ে এই পদ্ধতি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি চাঁদের মহাকর্ষীয় টান বা বড় ভূমিকম্পের মতো ঘটনায় সামান্য হলেও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু সিজিয়াম পরমাণুর কম্পাঙ্ক মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানেই স্থির, যা একে সময় পরিমাপের জন্য একটি আদর্শ ভিত্তি দিয়েছে।
কেন এই পরিবর্তনের প্রয়োজন?
যদি বর্তমান ব্যবস্থা এতই ভালো হয়, তবে বিজ্ঞানীরা কেন এটি পরিবর্তন করতে চাইছেন? উত্তরটি হলো, আরও বেশি নির্ভুলতার সন্ধান। জিপিএস নেভিগেশন, উচ্চ-গতির ইন্টারনেট, আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজার, এবং মহাকাশ গবেষণার মতো ক্ষেত্রগুলিতে সময়ের সূক্ষ্মতম পরিমাপ প্রয়োজন। বর্তমান সিজিয়াম ঘড়িগুলো প্রতি কয়েক কোটি বছরে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ভুল করতে পারে, যা যথেষ্ট নির্ভুল মনে হলেও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য তা যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, জিপিএস স্যাটেলাইটগুলো থেকে পাঠানো সময়ের সংকেতের সামান্যতম ত্রুটিও পৃথিবীতে আমাদের অবস্থানে বড় ধরনের ভুল দেখাতে পারে। একইভাবে, উচ্চ-গতির আর্থিক লেনদেনে এক সেকেন্ডের লক্ষ ভাগের এক ভাগ সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে আমাদের আরও নির্ভুল সময় পরিমাপের প্রয়োজন বাড়ছে, আর এখানেই বর্তমান সিজিয়াম ঘড়ি তার ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।
নতুন দিশা: অপটিক্যাল অ্যাটমিক ক্লক
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানীরা অপটিক্যাল অ্যাটমিক ক্লকের কথা বলছেন। এই ঘড়িগুলো সিজিয়ামের পরিবর্তে স্ট্রনটিয়াম, ইটারবিয়াম বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো মৌল ব্যবহার করে। মূল পার্থক্য হলো, এই ঘড়িগুলো মাইক্রোওয়েভ কম্পাঙ্কের পরিবর্তে অনেক উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির দৃশ্যমান আলো বা অপটিক্যাল ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে। একটি ঘড়ির পেন্ডুলাম যত দ্রুত দোলে, তার সময় তত নির্ভুল হয়। অপটিক্যাল ক্লকের 'পেন্ডুলাম' অর্থাৎ আলোর কম্পাঙ্ক সিজিয়াম ঘড়ির মাইক্রোওয়েভ কম্পাঙ্কের চেয়ে প্রায় লক্ষ গুণ বেশি দ্রুত। এর ফলে, এই ঘড়িগুলো বর্তমানের পারমাণবিক ঘড়ির চেয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১০০০ গুণ বেশি নির্ভুল হতে পারে। কিছু পরীক্ষামূলক অপটিক্যাল ক্লক এতটাই নির্ভুল যে, মহাবিশ্বের বয়সের সমান সময় ধরে চললেও (প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর) সেগুলো এক সেকেন্ডের সামান্য ভগ্নাংশও হারাবে না।
আমাদের জীবনে এর প্রভাব কী হবে?
সেকেন্ডের সংজ্ঞা পরিবর্তন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি কোনো প্রভাব ফেলবে না। আপনার ঘড়ির সময় হঠাৎ করে বদলে যাবে না। তবে এর পরোক্ষ প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। আরও নির্ভুল অপটিক্যাল ক্লক আমাদের জিপিএস ব্যবস্থাকে সেন্টিমিটার স্তরের নির্ভুলতা দিতে পারবে। এটি স্ব-চালিত গাড়ি এবং ড্রোন প্রযুক্তির জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। ইন্টারনেট এবং টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলো আরও ভালোভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ করা যাবে, যার ফলে ডেটা ট্রান্সফার আরও দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য হবে। фундаментаল বা মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায়ও এর বিশাল প্রভাব পড়বে। বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করতে, মহাবিশ্বের প্রসারণের হার আরও নির্ভুলভাবে মাপতে এবং এমনকি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মতো মৌলিক তত্ত্বগুলো পরীক্ষা করতে এই ঘড়িগুলো ব্যবহার করতে পারবেন।
কবে এবং কীভাবে এই পরিবর্তন আসবে?
সময়ের একক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি রাতারাতি নেওয়া হবে না। International Bureau of Weights and Measures (BIPM) এবং এর অন্তর্গত Consultative Committee for Time and Frequency (CCTF) এই প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণাগারে অপটিক্যাল ক্লকগুলোর স্থিতিশীলতা এবং নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সেকেন্ডের একটি নতুন সংজ্ঞা প্রস্তাব করা, যা এক বা একাধিক অপটিক্যাল ট্রানজিশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। এই পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয় এবং ঐকমত্য প্রয়োজন হবে, যাতে বিশ্বজুড়ে সময়ের পরিমাপে একটি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এটি একটি সতর্ক এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যা নিশ্চিত করবে যে সময়ের এই নতুন সংজ্ঞাটি আগামী কয়েক দশক ধরে মানবজাতির চাহিদা মেটাতে সক্ষম।












