সেরা হওয়ার পক্ষে জোরালো দাবি
বিশ্বকাপ জয় যেকোনো দলের জন্য চূড়ান্ত স্বীকৃতি। আর স্পেনের এই জয় কোনো আকস্মিক সাফল্য নয়, বরং ধারাবাহিকতার ফসল। তারা ইউরো ২০২৪ জয়ের পর বিশ্বকাপ জিতল। এই টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে,
যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য একটি রেকর্ড। সেমিফাইনালে ফ্রান্স এবং ফাইনালে আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য। ফাইনালে তারা এতটাই আধিপত্য দেখিয়েছে যে, লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে পুরো ম্যাচে একটিও গোলপোস্টে শট নিতে দেয়নি। বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়া এবং সঠিক সময়ে আক্রমণ করার যে কৌশল কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে প্রয়োগ করেছেন, তা প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রমাণিত হয়েছে। রদ্রির মতো একজন মিডফিল্ড জেনারেল, যিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন, এবং উনাই সিমনের মতো গোলরক্ষক, যিনি গোল্ডেন গ্লাভস জিতেছেন, তাদের শক্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিরক্ষার শিল্প, কিন্তু আক্রমণ?
স্পেনের এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণ এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। রদ্রি, পাউ কুবারসির মতো খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরুর আগেই নষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু সেরা দল হতে গেলে শুধু রক্ষণ নয়, আকর্ষণীয় এবং ধারালো আক্রমণও জরুরি। এই বিশ্বকাপে স্পেন গোল করার জন্য কিছুটা संघर्ष করেছে। ফাইনালের জয়সূচক গোলটিও এসেছে অতিরিক্ত সময়ে, বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেসের পা থেকে। সমালোচকরা বলছেন, স্পেনের খেলা কার্যকরী হলেও সবসময় зрелищное বা দর্শনীয় নয়। তারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু গোল করার জন্য প্রায়শই একজন নিখুঁত ফিনিশারের অভাব চোখে পড়ে। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে টুর্নামেন্টে ১০টি গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন, যা স্পেনের আক্রমণভাগের দুর্বলতাকে কিছুটা হলেও তুলে ধরে। তাই প্রশ্ন ওঠে, যে দলের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে পারে না, তাদের কি безоговорочно বা প্রশ্নাতীতভাবে সেরা বলা যায়?
প্রতিদ্বন্দ্বীরাও পিছিয়ে নেই
স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও, বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে আরও কয়েকটি দল প্রায় তাদের সমকক্ষ। ফাইনালে পরাজিত হলেও আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে যে তাদের মানসিক দৃঢ়তা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা প্রবল। অন্যদিকে, টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল হিসেবে বিবেচিত ফ্রান্স সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারলেও তাদের দলে এমবাপ্পের মতো তারকা রয়েছেন, যিনি একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ইংল্যান্ড, পর্তুগাল বা ব্রাজিলের মতো দলগুলোও নিজেদের দিনে যেকোনো প্রতিপক্ষকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। একটি টুর্নামেন্টের ফলাফল দিয়ে পুরো বিশ্ব ফুটবলের শক্তি বিচার করা কঠিন। স্পেনের ৩৮ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়, কিন্তু সেরা দলের তকমা ধরে রাখতে হলে এই ধারাবাহিকতা আগামী কয়েক বছর বজায় রাখতে হবে।
একটি নতুন যুগের সূচনা?
এই স্প্যানিশ দলটিকে ২০০৮-২০১২ সালের 'সোনালী প্রজন্মের' সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সেই দলের মতো এই দলেও রয়েছে তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার মিশ্রণ। লামিনে ইয়ামাল এবং পাউ কুবারসির মতো উনিশ বছর বয়সী খেলোয়াড়রা যেমন নির্ভয়ে খেলছেন, তেমনই রদ্রির মতো অভিজ্ঞরা দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কোচ দে লা ফুয়েন্তে যুব দল থেকে খেলোয়াড় তুলে এনে একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করেছেন, যা স্পেনের ফুটবল ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। শুধু পুরুষ দল নয়, স্পেনের মহিলা দলও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। একটি দেশ একই সাথে পুরুষ ও মহিলা ফুটবলে বিশ্বসেরা, যা তাদের ফুটবল কাঠামোর গভীরতার প্রমাণ দেয়। তাই এই জয়কে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সাফল্য হিসেবে না দেখে, একটি নতুন স্প্যানিশ যুগের সূচনা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।













