স্কালোনির মাস্টারপ্ল্যান: কৌশল যখন কথা বলে
লিওনেল স্কালোনি নিছক একজন কোচ নন, তিনি যেন একজন शतरंजের গ্র্যান্ডমাস্টার। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বুঝে তিনি ঘুঁটি সাজান। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এর নিখুঁত প্রমাণ মিলেছে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে যেখানে
আক্রমণাত্মক ৩-৫-২ ছকে খেলে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানেই আবার অস্ট্রিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে কৌশল বদলে ৪-৪-২ ছকে রক্ষণ সামলে জয় তুলে নেওয়া হয়েছে। [19] স্কালোনির দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কৌশলগত নমনীয়তা, যা ফুটবল বিশ্বে 'লিকুইড ফরমেশন' হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। [19] ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী এই দল মুহূর্তেই নিজেদের খেলার ধরণ বদলে ফেলতে পারে। এই কৌশলের কারণেই আর্জেন্টিনা শুধু সুন্দর ফুটবলই খেলে না, বরং কার্যকর ফুটবল খেলে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে। প্রতিটি ম্যাচেই তার দল নতুন পরিকল্পনার সাথে মাঠে নামে, যা প্রতিপক্ষকে হতবাক করে দেয়। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে তিন ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট অর্জন করা স্কালোনির কোচিং বুদ্ধিমত্তারই পরিচায়ক। [15]
একনায়কতন্ত্র নয়, দলগত শক্তির জয়
একটা সময় ছিল যখন ভাবা হতো, লিওনেল মেসি যেদিন নিষ্প্রভ থাকবেন, সেদিন আর্জেন্টিনাও পথ হারাবে। কিন্তু 'স্কালোনি-যুগের' আর্জেন্টিনা এই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই দল আর মেসি-নির্ভর নয়, বরং মেসি-কেন্দ্রিক। অর্থাৎ, মেসি দলের মধ্যমণি, কিন্তু পুরো দলটাই একসুতায় গাঁথা এক যোদ্ধা। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ। [4] নকআউট পর্ব নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় স্কালোনি প্রথম একাদশে নয়টি পরিবর্তন আনেন এবং মেসিকে বেঞ্চে রাখেন। [5] কিন্তু তাতেও দলের জিততে কোনো সমস্যা হয়নি। জিওভানি লো সেলসো এবং লাউতারো মার্তিনেজের গোলে প্রথমার্ধেই দল এগিয়ে যায়। [9] পরে মেসি বদলি হিসেবে নেমে একটি গোল করলেও, তার আগেই তরুণ তুর্কিরা বুঝিয়ে দেয় যে তারাও ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রাখে। [8] এই ঘটনাই প্রমাণ করে, আর্জেন্টিনার বেঞ্চ কতটা শক্তিশালী এবং দলের প্রতিটি সদস্য নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে কতটা সচেতন।
মানসিকতার নাম 'জয়'
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় ছিল এই দলটার জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট। দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে সেই জয় মেসি এবং পুরো দলকে এক অদম্য মানসিক শক্তি দিয়েছে। এরপর ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ জয় সেই বিশ্বাসকে আরও মজবুত করেছে। এখন আর্জেন্টিনা শুধু জিততে মাঠে নামে না, তারা বিশ্বাস করে যে তারা যেকোনো পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ বের করে আনতে পারে। এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় কঠিন মুহূর্তে। যেমন, ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় চিলির বিপক্ষে ম্যাচে যখন গোল আসছিল না, তখন ৮৮ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। [11] এই 'শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার' মানসিকতাই একটি সাধারণ দল এবং একটি চ্যাম্পিয়ন দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। এই জয়ের অভ্যাসই এখন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তারা জানে, কীভাবে স্নায়ুর চাপ সামলে, কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়তে হয়।
জাদুকরের শেষ তুলির টান
দলগত শক্তি যতই থাকুক, লিওনেল মেসির প্রভাবকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা মেসি যেন আরও ধারালো, আরও পরিণত। তিনি এখন শুধু গোল করেন না, পুরো খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। প্লে-মেকার হিসেবে তার ভূমিকা দলের তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য কাজটা সহজ করে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তার ফর্ম তুঙ্গে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক থেকে শুরু করে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে নেমে রেকর্ডগড়া গোল—সবই যেন তার জাদুকরী অধ্যায়ের নতুন পাতা। [4, 15, 5] টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। [7] তার উপস্থিতি শুধু প্রতিপক্ষের মনেই ভয় ধরায় না, নিজের দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই বিশ্বকাপে তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি পাস আর্জেন্টিনাকে শিরোপার আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে।












