একনায়কের বিশ্বকাপ: মারাদোনার মেক্সিকো ৮৬
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপকে অনেকেই 'মারাদোনার বিশ্বকাপ' বলে থাকেন। সেবার আর্জেন্টিনা দল কাগজে-কলমে সেরা ছিল না, কিন্তু তাদের একজন মারাদোনা ছিলেন। ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তাপের আবহে ইংল্যান্ডের
বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেই ম্যাচে মারাদোনা দুটি গোল করেন, যা ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমটি ছিল বিতর্কিত 'হ্যান্ড অফ গড', যা তিনি নিজেই পরে ঈশ্বরের হাতের সাথে নিজের মাথার চাল বলে বর্ণনা করেন। এর মাত্র চার মিনিট পরেই তিনি শতাব্দীর সেরা গোলটি করেন, যেখানে প্রায় ৬০ গজ দৌড়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড় এবং গোলকিপারকে কাটিয়ে বল জালে জড়ান। এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার ১৪টি গোলের মধ্যে ১০টিতেই মারাদোনার সরাসরি অবদান ছিল (৫টি গোল ও ৫টি অ্যাসিস্ট)। তার জাদুকরী প্রতিভা, অদম্য জেদ এবং নেতৃত্ব একটি সাধারণ দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আসনে বসিয়েছিল।
মারাদোনার জুতোয় পা গলানোর চাপ
মারাদোনার অবসরের পর আর্জেন্টিনা ফুটবলে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। এরপর যাঁকেই প্রতিভাবান মনে হয়েছে, তাঁকেই 'নতুন মারাদোনা'র তকমা দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল প্রত্যাশার চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছেন লিওনেল মেসি। ছোটবেলা থেকেই তার তুলনা শুরু হয় মারাদোনার সঙ্গে। কিন্তু দুজনের খেলার ধরণ এবং ব্যক্তিত্ব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মারাদোনা ছিলেন বিদ্রোহী, আবেগপ্রবণ এবং স্পষ্টভাষী নেতা। অন্যদিকে, মেসি বরাবরই শান্ত, অন্তর্মুখী এবং নিজের খেলা দিয়ে নেতৃত্ব দিতে বিশ্বাসী। বছরের পর বছর ধরে ক্লাব ফুটবলে সম্ভাব্য সবকিছু জেতার পরেও, জাতীয় দলের হয়ে একটি বড় ট্রফি না জেতার যন্ত্রণা তাকে তাড়া করে বেড়াত।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং মেসির অবিসংবাদিত হয়ে ওঠা
লিওনেল মেসির জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে সাফল্য ছিল এক দীর্ঘ এবং কষ্টকর যাত্রা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পেনাল্টিতে পরাজয়—এই ব্যর্থতাগুলো তাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। ২০১৬ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন, যদিও পরে ফিরে আসেন। অবশেষে ২০২১ সালে ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে ব্রাজিলকে তাদের ঘরের মাঠেই হারিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। এটি ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি এবং এই জয় তাকে ও পুরো দলকে এক নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়। এই জয়ের মাধ্যমে মেসি যেন জাতীয় দলের নেতা হিসেবে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পান।
অবশেষে রাজ্যাভিষেক: কাতার বিশ্বকাপ ২০২২
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এক নতুন মেসিকে দেখা যায়। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর আর্জেন্টিনা খাদের কিনারায় চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে প্রতিটি ম্যাচই ছিল তাদের জন্য নকআউট। আর এই কঠিন সময়েই মেসি তার সেরাটা বের করে আনেন। তিনি শুধু গোলই করেননি, পুরো দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উত্তপ্ত মুহূর্তে বা সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তার জাদুকরী অ্যাসিস্ট—সবকিছুতেই ছিল একজন পরিণত নেতার ছাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটিকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে গণ্য করা হয়। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি শুটআউটে জেতে এবং ৩৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়নের শিরোপা পুনরুদ্ধার করে। মেসি টুর্নামেন্টে ৭টি গোল করে গোল্ডেন বল জেতেন এবং তার বর্ণাঢ্য কেরিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতাও পূরণ করেন।












