সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
গঞ্জালো মন্তিয়েলের শেষ পেনাল্টি শট জালে জড়াতেই গোটা বিশ্ব দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সতীর্থরা যখন লিওনেল মেসিকে ঘিরে উল্লাসে মত্ত, তখন ভিড়ের মধ্যে থেকে দৌড়ে এলেন এক নারী। পরনে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি।
তিনি আর কেউ নন, মেসির মা—সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তাঁর সেই কান্না কোনো সাধারণ আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। সেই কান্নায় মিশে ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, একরাশ অভিমানের মুক্তি আর সর্বোপরি, একজন মায়ের তাঁর সন্তানের স্বপ্নপূরণের সাক্ষী থাকার চরম আবেগ। মাঠের সমস্ত কোলাহলকে ছাপিয়ে মা-ছেলের সেই আলিঙ্গন মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মানবিক মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
শুধু আনন্দ নয়, ছিল মুক্তির কান্না
সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির চোখের জল কেবল আনন্দের ছিল না, ছিল মুক্তির। দশকের পর দশক ধরে তাঁর ছেলে বিশ্ব ফুটবলের শিখরে থেকেও দেশের হয়ে একটি বড় ট্রফি না জেতার কারণে যে কঠিন সমালোচনা সহ্য করেছেন, তার সাক্ষী ছিল পরিবার। বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর মেসি ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর হার। প্রতিবারই সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে মেসিকে। একজন মা হিসেবে সেলিয়া দেখেছেন ছেলের এই কষ্ট। তাই কাতারের মাটিতে যখন মেসির হাতে বিশ্বকাপ উঠল, তখন তাঁর মনে হয়েছে, ছেলে অবশেষে সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠল। এই কান্না ছিল সেই সব জমাট বাঁধা কষ্ট থেকে মুক্তির কান্না, যা একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য অনুভব করেন।
মায়ের মন আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা
বিশ্বকাপ চলাকালীন একাধিক সাক্ষাৎকারে সেলিয়া জানিয়েছিলেন, তিনি কতটা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। এমনকি, স্নায়ুর চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক সময় তিনি খেলাও দেখতে পারতেন না। ফাইনালের আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি চাই ও বিশ্বকাপটা উপভোগ করুক। এর বেশি কিছু চাই না।” তিনি আরও জানান, তাঁদের পুরো পরিবার কতটা কষ্ট পেয়েছে। তাঁর কথায়, “আমাদের অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সবকিছুর শেষটা ভালোই হবে।” এই কথাগুলোই প্রমাণ করে, মেসির বিশ্বকাপ জয়টা শুধু তাঁর একার স্বপ্ন ছিল না, এটা ছিল গোটা পরিবারের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের ভার সবচেয়ে বেশি বহন করেছেন তাঁর মা। তাই ফাইনালের বাঁশি বাজার পর তাঁর আবেগ বাঁধ মানেনি।
সমালোচনার জবাব আর পরিবারের জয়
আর্জেন্টিনায় একটা বড় অংশের সমর্থক এবং মিডিয়া প্রায়ই বলত, মেসি যতটা বার্সেলোনার, ততটা আর্জেন্টিনার নন। দেশের হয়ে খেলার সময় তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। এই সমস্ত অভিযোগ মেসির পাশাপাশি তাঁর পরিবারকেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করত। সেলিয়া একসময় বলেছিলেন, “মানুষকে বলতে শুনি, মেসি নাকি দেশকে ভালোবাসে না। এটা শুনলে খুব কষ্ট হয়। কেউ যদি দেখত, ও দেশের হারের পর কতটা কাঁদে, তাহলে এসব বলত না।” তাই বিশ্বকাপ জয় ছিল এই সমস্ত সমালোচনার এক মোক্ষম জবাব। এই জয় শুধু মেসিকে নয়, তাঁর পরিবারকেও সম্মান এনে দিয়েছিল। এটা ছিল পরিবারের সম্মিলিত জয়, যেখানে একজন মায়ের আত্মত্যাগ এবং সমর্থন সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
এক পরিপূর্ণ বৃত্তের সমাপ্তি
রোজারিওর যে ছোট্ট ছেলেটি হরমোনের সমস্যায় ভুগেছিল, যাকে নিয়ে তাঁর পরিবার এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছিল শুধু তার চিকিৎসার জন্য, সেই ছেলেটি যখন বিশ্ব ফুটবলের শেষ কথা—বিশ্বকাপ—জয় করে, তখন মায়ের আবেগপ্রবণ হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। সেলিয়ার কান্না ছিল এক পরিপূর্ণ বৃত্তের সমাপ্তি। শৈশবের কষ্ট, কৈশোরের সংগ্রাম, যৌবনের একের পর এক ব্যর্থতা—সবকিছু পেরিয়ে তাঁর ছেলে অবশেষে সেরার সেরা। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? তাঁর চোখের জল আসলে জানিয়ে দিচ্ছিল, এই ট্রফিটা শুধু আর্জেন্টিনার নয়, এই ট্রফিটা তাঁর 'লিও'-র, আর এই জয়টা তাঁর পরিবারের।















